চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা :
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই সারাদেশে বেজে উঠেছে নির্বাচনী ডামাডোল। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী গত ২০ জানুয়ারি ছিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন এবং ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আজ ২২ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা।
দেশে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এবারের নির্বাচন নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে শুরুতে কিছুটা অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। নির্বাচন আদৌ হবে কিনা—এমন প্রশ্ন, গ্রাম-গঞ্জে গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ভোটারদের মনে বিরাজ করছিল। ফলে নির্বাচন নিয়ে তেমন কোনো উৎকণ্ঠা বা উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়নি। তবে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচার। নির্বাচন আচরণবিধি মেনে প্রার্থীরা ও তাদের কর্মী-সমর্থকেরা প্রতিদিনই ছুটবেন ভোটারদের দোরগোড়ায়। এর মধ্য দিয়ে ভোটারদের মাঝেও নতুন করে নির্বাচন নিয়ে আলোচনা ও ভাবনার সূচনা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বাইরে গণভোট প্রদানের বিষয়টি নিয়েও ভোটারদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধা ও জড়তা কাজ করছে। যদিও গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে সরকারিভাবে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। দেশের প্রতিটি মসজিদে জুমার নামাজের আগে ইমামগণ গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে বয়ান দিচ্ছেন। একই সঙ্গে অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ফেস্টুন ও ব্যানার টাঙানো হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিবর্তনের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানের আহ্বান জানিয়ে ব্যাপক লেখালেখি ও প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে।
জাতীয় সংসদের ৭০ নম্বর আসন পাবনা-৩ এ এবারের নির্বাচনে মোট ৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। বাছাই ও আপিল প্রক্রিয়ায় একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ে তিনি পুনরায় নির্বাচনী মাঠে ফিরে আসেন। ফলে এ আসনে মোট ৮ জন প্রার্থীই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
প্রার্থীরা হলেন—
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন (প্রতীক : ধানের শীষ),
জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মাওলানা মোহাম্মদ আলী আছগার (প্রতীক : দাঁড়িপাল্লা),
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক এমপি আলহাজ কে. এম. আনোয়ারুল ইসলাম (প্রতীক : ঘোড়া),
জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী মীর নাদিম মোহাম্মদ ডাবলু (প্রতীক : লাঙ্গল),
গণঅধিকার পরিষদ মনোনীত প্রার্থী মো. হাসানুল ইসলাম রাজা (প্রতীক : ট্রাক),
গণফোরাম মনোনীত প্রার্থী সরদার আশা পারভেজ (প্রতীক : উদীয়মান সূর্য),
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুল খালেক (প্রতীক : হাতপাখা) এবং
বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি মনোনীত প্রার্থী মো. মাহবুবুর রহমান জয় চৌধুরী (প্রতীক : একতারা)।
পাবনা-৩ আসনটি চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর—এই তিনটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৮০৪ জন। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। দীর্ঘদিন ধরে এই উপজেলা থেকে কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে উন্নয়ন বঞ্চনার অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকাশ্যে কেউ বিরোধিতায় না জড়ালেও সাধারণ ভোটারদের মনে স্থানীয় প্রার্থীর প্রতি একটি স্বাভাবিক টান কাজ করছে।
এ অবস্থায় পাবনা-৩ আসনে ধানের শীষ, ঘোড়া ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বাস্তবতায় ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের ভোট একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে থাকলেও ‘দাঁড়িপাল্লা’ ও ‘ট্রাক’ প্রতীকের ভোটের গতিবিধির ওপর ‘ঘোড়া’ প্রতীকের ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে। যদি ‘দাঁড়িপাল্লা’ ও ‘ট্রাক’ প্রতীকের ভোট বৃদ্ধি পায়, তাহলে ‘ঘোড়া’ প্রতীকের ভোট কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অপরদিকে, ওই দুই প্রতীকের ভোট কমলে ‘ধানের শীষ’ ও ‘ঘোড়া’ প্রতীকের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।
অনেকের ধারণা, বিগত প্রায় ১৭ বছর ধরে ভাঙ্গুড়া উপজেলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এবারের নির্বাচনে ভোটাররা চাটমোহরের প্রার্থীদের প্রতি ঝুঁকতে পারেন। পাশাপাশি কেন্দ্রভিত্তিক ভোটার উপস্থিতি, আওয়ামী লীগ কর্মী-সমর্থকদের ভূমিকা এবং নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনী ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।