
এম এইচ মুন্না:
রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি এবং প্রভাবশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে গভীর সংশ্লিষ্টতার গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েও কার্যত দায়মুক্তির সুবিধা ভোগ করছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. ফজলুল হক (মধু)। নামমাত্র প্রশাসনিক শাস্তির আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি পুনরায় সক্রিয় হয়েছেন পুরনো প্রভাববলয়ে যেখানে অভিযোগ, নিয়ম নয়; প্রভাবই হয়ে উঠেছে নিয়ন্ত্রণের মূল হাতিয়ার।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাস্তবায়নাধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, যৌথ পরিমাপ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে আসে, বাস্তব কাজের অগ্রগতির তুলনায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে অন্তত সাড়ে ১০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। আলোচিত ঠিকাদার এসএম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে এই অর্থ ছাড়ের ঘটনাটি প্রশাসনিকভাবে প্রমাণিত হলেও, রহস্যজনকভাবে দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
বরং, ঘটনার পরপরই তদন্তের নামে গঠিত হয় একাধিক প্রশ্নবিদ্ধ কমিটি, জারি হয় পরস্পরবিরোধী অফিস আদেশ এবং শুরু হয় দীর্ঘ চিঠি চালাচালির নাটক। সংশ্লিষ্ট মহলের ভাষ্য, এটি ছিল মূলত সময়ক্ষেপণ এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রশাসনিক কৌশল। যেখানে বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত, শোকজ এবং বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত ছিল, সেখানে উল্টো পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়নের সুযোগ পান ফজলুল হক।
গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, শেরেবাংলা নগর-১ ডিভিশনে দায়িত্ব পালনকালে তিনি একটি শক্তিশালী ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি প্রকল্পের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জি কে শামীম গ্রেপ্তারের পর এই নেটওয়ার্কের আংশিক চিত্র সামনে এলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই তা অদৃশ্য হয়ে যায় প্রশাসনিক ছায়ার আড়ালে।
পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং অভ্যন্তরীণ লবিংয়ের মাধ্যমে তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেন তিনি। ফলশ্রুতিতে, গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে কেবল বেতন গ্রেড নিম্নধাপে নামিয়ে আনার মতো লঘু শাস্তি দিয়ে দায় এড়িয়ে যায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যা সুশাসনের জন্য এক প্রশ্নবিদ্ধ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বর্তমানে যশোর গণপূর্ত সার্কেলে দায়িত্ব পালনকালে নতুন করে টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের অনুমতি দিয়ে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কুষ্টিয়া, যশোর, নড়াইল, মাগুরা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহসহ একাধিক জেলায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে সরকারের বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া কার্যত ভেঙে পড়ছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য দৈনিক গণতদন্ত পত্রিকার প্রধান সম্পাদক স্বাক্ষরিত একটি অফিসিয়াল চিঠি প্রেরণ করা হলেও ফজলুল হক কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাননি। পরবর্তীতে তার বর্তমান কর্মস্থল যশোরে সরেজমিনে গেলে প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি দ্রুত সরে পড়েন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরে তার স্টাফ অফিসার সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, “স্যার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন।”
অন্যদিকে, শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত বিভাগের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এমনকি তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তা রিসিভ করা হয়নি।
এ যেনো শকুনের চোখে গণপূর্তের ভবিষ্যৎ; এখানেই শেষ নয়… চলবে!!!