মোঃ গোলাম রাব্বী,স্টাফ রিপোর্টার:- পটুয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের বিরুদ্ধে এবার পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) এডভোকেট রুহুল আমিন। তার অভিযোগ— বিচারক নিলুফার শিরিন আদালতকে ব্যক্তিগতভাবে পরিচালনা করছেন এবং ঘনিষ্ঠ আইনজীবী ও কোর্টকর্মচারীদের নিয়ে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের স্বার্থে বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়, “ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের বাসায় টাকার খাম পাঠিয়েছেন পিপি।”
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এডভোকেট রুহুল আমিন তার স্বাক্ষরিত একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠান। পাশাপাশি নিজের ফেসবুক আইডিতেও একই বিষয় নিয়ে পোস্ট করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন— এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগ। আমি কখনোই বিচারকের বাসার কাজের মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ করিনি, এমনকি মোবাইলে ঘুষের কোনো প্রস্তাবও দিইনি।
পিপির দাবি, বিচারক নিলুফার শিরিন কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আইনজীবী ও কোর্টের কর্মচারীদের নিয়ে একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। মামলার জামিন, খালাস কিংবা অব্যাহতির আদেশ অনেক সময় আদালতের বাইরে, বিচারকের বাসায় বসেই দেওয়া হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, বিচারক নিলুফার শিরিন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিমের ঘনিষ্ঠজন। তার বাবা একসময় পটুয়াখালীতে সাব-রেজিস্ট্রার ছিলেন এবং তিনি পটুয়াখালী শেরে বাংলা স্কুলে পড়াশোনা করেন। সেই সূত্রে স্থানীয় আইনজীবীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি আদালতের ভেতরে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর জেলা জুড়ে পিপি-জিপি নিয়োগকে ঘিরে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিএনপি-সমর্থিত আইনজীবী ফোরামের একাংশ তখন তার নিয়োগের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। বিক্ষোভ, মিছিল এমনকি হামলার শিকার হন তিনি। তার চেম্বারে ভাঙচুর চালানো হয়, ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটে। সেই সময় থেকেই একটি মহল আমাকে দমানোর চেষ্টা করছে। বিচারক মহোদয়ও এখন তাদের সঙ্গে মিলে আমাকে একঘরে করার ষড়যন্ত্র করছেন।
পিপি আরও অভিযোগ করেন, বিচারক নিলুফার শিরিন চাঞ্চল্যকর লামিয়া ধর্ষণ মামলায় আসামিদের ব্যাপক সুবিধা দিয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণের সময় তাকে উল্টো ধমক দেওয়া হয়। চার্জশিট আসার পর আসামী ইমরান মুন্সিকে বাঁচাতে তাকে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করতে চাপ দেওয়া হয়। এছাড়াও বিগত দিনে নারী ও শিশু মামলা নং- ১৪৫/২৫ ধারা ১১(গ)/৩০ মামলায় একজন পর্দাশীল বিচার প্রার্থী মহিলাকে খাস কামরায় নিয়ে পুলিশ ডেকে চর থাপ্পড় মারেন। এমনকি ওপেন কোর্টে হাইকোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন বলেও দাবি তার।
অন্যদিকে আদালতে নিয়মিত না বসা, বৃহস্পতিবার কোর্ট না করা, সাক্ষীদের বয়ান গ্রহণে গড়িমসি, বিচার প্রার্থীদের নিকট থেকে শাক, সবজি, মাছ, মাংসসহ বিভিন্ন উপঢৌকন গ্রহণ করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, আমি এগুলোর প্রতিবাদ করিলে বিজ্ঞ বিচারক মহোদয় আমার উপরে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হন। আমাকে এজলাস চলাকালীন সময়ে অন্যান্য আইনজীবীদের সামনে বিভিন্ন রকম তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করিয়া কথাবার্তা বলিয়া আমার মান সম্মান ক্ষুন্ন করেন। আমি অত্যন্ত ধৈর্য এবং সহনশীলতার সাথে আমার উপরের অর্পিত রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করার চেস্টা চালিয়ে যাই। বিজ্ঞ বিচারক মহোদয় কে সু-পথে ফিরিয়ে আনতে ডক্টর মিজানুর রহমান আজহারীর এক নজরে কুরআন বইটি উপহার হিসেবে পাঠাই। যেহেতু সে একজন কট্টর ইসলাম বিদ্বেষী মানুষ তাই এটাকে সে ভালো ভাবে গ্রহণ করতে পারে নাই।
এব্যাপারে জানতে চাইলে পিপি অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন বলেন' 'আমি পিপি হওয়ার পর থেকেই একটি মহল বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে মিছিল করেছে, চেম্বার ভাঙচুর করেছে, আমাকে মেরে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। আমার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন বিজ্ঞ বিচারকও। নারী শিশু কোর্টের পেশকার, তার ভাই একজন আইনজীবী এবং বিচারকসহ সিন্ডিকেটভুক্তরা বিশেষ সুবিধা দিতে গিয়ে আমাকে একমাত্র প্রতিবন্ধক হিসেবে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এর নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত চাই।
এব্যাপারে জানতে চাইলে পটুয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিলুফার শিরিন বলেন, 'সিন্ডিকেটের যে অভিযোগটি আনা হয়েছে এটি সঠিক নয়। আমার বাবা পটুয়াখালীতে সাব রেজিস্ট্রার ছিলেন। আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। শের ই বাংলা স্কুলে পড়তাম আমি। এটা আশির দশকের কথা। এরপর এই প্রথম আমি পটুয়াখালী আসলাম। আমার বাড়ি বরিশাল ঠিক আছে। কিন্তু এখানে আমি চয়েজ করে আসিনি। এখানে আমার কোন সিন্ডিকেট নেই। আমার সঙ্গে যা ঘটেছে, সেটাতে আমি অপমান বোধ করেছি। সেটাই চিঠিতে উল্লেখ করেছি। এখন কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিবেন। আমার সবকিছুর ডকুমেন্টস আছে।
উল্লেখ্য, পটুয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (সিনিয়র জেলা জজ) নিলুফার শিরিনকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে উক্ত ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মো. রুহুল আমিনের পিপির পদ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে জেলা আইনজীবী সমিতি। একই সঙ্গে তাকে সাত দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকা বার কাউন্সিলের সচিব বরাবর দেওয়া লিখিত অভিযোগে বিচারক নিলুফার শিরিন উল্লেখ করেন, গত ২০ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে তার বাসার গৃহপরিচারিকার মাধ্যমে মামলার নথিপত্রসহ ৫০ হাজার টাকার একটি বান্ডিল পাঠান পিপি রুহুল আমিন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, নারী ও শিশু বিষয়ক একটি মামলায় জামিনের ব্যাপারে বারবার মোবাইল ফোনে সুপারিশ করেছিলেন পিপি রুহুল আমিন। এছাড়া আলোচিত শহীদ জসিম উদ্দীনের মেয়ের ধর্ষণ মামলায়ও আসামিপক্ষের হয়ে যোগাযোগ করার অভিযোগ রয়েছে পিপির বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বিচারক উল্লেখ ক