নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
সন্ধ্যা হলেই ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জের কদমতলী, তেলঘাট, চুনকুটিয়া হিজলতলা ও জনি টাওয়ারের মতো ব্যাস্ততম স্থান গুলোতে অবস্থিত সালশা দোকানের নামে নেশার পিনিকের দোকান গুলো জমে ওঠে রমরমা পিনিক বানিজ্যে।
কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে কিশোর হতে শুরু করে তরুণ ও মধ্যে বয়সের ক্রেতাদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে ওঠে এই পিনিকের দোকান।
তাদের অনেকেই আসেন অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে। বেশিরভাগ দোকানের নেই কোনো সাইনবোর্ড।
বাইরের দিকটা একটু সাদামাটা হলেও ভেতরটা কিন্তু খুব সুন্দর, বসার জন্য টুল, বেঞ্চ, চেয়ার কেউ কেউ আবার সোফাও সাজিয়ে রেখেছে। দিন দিন বেড়েই চলছে এসব দোকানের কদর।
আশপাশের লোকজনের কাছে এগুলো সালশার দোকান মনে হলেও ভিতরে এটা একটা মরন ফাঁদ। আর এই মরন ফাঁদে পা দিচ্ছে সব উঠতি বয়সের কিশোর ও যুবকরা।
এই পিনিক নামের সালশার সাথে মেশানো হয় স্নায়ু উত্তেজক উপাদান এবং ক্যাফেইন নামের ভয়ংকর মাদক, আর এই নতুন নেশার টানেই প্রতি রাতে পিনিক সেবনের জন্য ‘সালসার দোকান’ নামে পরিচিতি এই দোকানগুলোতে ছুটে আসেন তরুণরা।
মাত্রাভেদে ১৫০ টাকা থেকে ২৫০ টাকায় এই সালশা নামের পিনিকের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন তারা।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে কেরানীগঞ্জের এই সালশার নামে পিনিকের দোকান গুলিতে যে ধরনের সালশা বিক্রি হয় তার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকার প্রাণকেন্দ্র নারিন্দায়। যিনি এই সালশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক তার নাম রুহুল আমিন কবিরাজ তিনি কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।
যদিও সালশা শব্দটা শুনলেই আমরা বুঝতে পারি এটা একটি আয়ুর্বেদীক ঔষধ। তাই যিনি এই আয়ুর্বেদীক ঔষধ প্রস্তুত করবেন তার নিশ্চয়ই ইউনানি ও আয়ুর্বেদীক মেডিকেল কলেজ হতে কোর্স সম্পন্ন করা সনদ থাকতে হবে।
তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় যাহার নেই নিজের নাম সাক্ষর করার যোগ্যতা সে কি করে কবিরাজ পরিচয় দিয়ে এই সালশা উৎপাদন করে। তারই ধারাবাহিকতায় কবিরাজ রুহুল আমিনের উত্তর সুরি "সুমনা" ও "নাঈম" নামের একজন এই মরন ফাঁদ "পিনিক সালশা" তৈরি করে আসছে। এদেরও নেই কোনো রকম শিক্ষাগত যোগ্যতা, এমনকি তারা তাদের নামটা পর্যন্ত বাংলায় লিখতে জানেনা।
তাহলে কি করে রাতারাতি হয়ে গেল তারা সুনামধন্য কবিরাজ।
কেরানীগঞ্জে এরকম ৯টি সালসা পিনিকের দোকানের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই দোকান গুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকার মাদক মিশ্রিত "সালশা পিনিক" বিক্রি হচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে নানা বয়সী তরুণ ও যুবকদের এই "পিনিক সালশা " মাদক খেয়ে বুঁদ হয়ে থাকার ভয়ংকর চিত্রও দেখা গেছে।
এক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভয়ংকর তথ্য, মাদকমিশ্রিত এই "সালশা পিনিক" উৎপাদক ও সরবরাহকারীদের বিস্তারিত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে এই "সালশা পিনিক" প্রস্তুতকারী ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের নাম " শুভ আজমেরী দাওয়াখানা" যার মালিক জনৈক হেকিম "নাঈম" তিনি নিজেকে হেকিম - কবিরাজ হিসেবে জাহির করে আসছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি কোন কবিরাজ বা হেকিম নয়, সে নিজের ইচ্ছে মতো ফর্মূলা ব্যাবহার করে তৈরি করে আসছে এই "সালশা পিনিক"
তার নেই কোনো হেকিমি বা আয়ুর্বেদীক প্রশিক্ষণ ও সনদ।
নামধারী এই ভূয়া কবিরাজ "নাঈম" রাজধানী ঢাকার নারিন্দার বাসিন্দা।
এই ভূয়া নামধারী কবিরাজ "নাঈমের" প্রতিটি সালশার বোতলে ঋষিকেশ রোড নারিন্দার ঠিকানা দেয়া থাকলেও বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে গত ২০২৫ সালে এই নাঈমের কারখানা ঋষিকেশ রোডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি টিম তল্লাশি চালায় কিন্তু সেখানে দেখা মেলেনি ঐ কারখানার। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কারখানার সন্ধান মিলে সূত্রাপুরের কেবি রোডের ছোট্ট একটি গলির ভেতরে এক ভবনের দোতলায়।
সেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি অভিযান পরিচলানা করে এবং প্রচুর পরিমানে এই মাদক মিশ্রিত সালশার বোতল ও উৎপাদন করার নানা ধরনের উপকরন উদ্ধার করে। "নাঈম"কে প্রধান আসামি করে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা সহ ভূয়া কবিরাজ "নাঈমে"র পারিচালিত কয়েকটি দোকান সিলগালা করে দেয়।
কিন্তু এতো কিছুর পরেও থেমে নেই নাঈম ও তার সহধর নাসির নামের আরেক মাদক মিশ্রিত "সালশা পিনিক" এর ব্যাবসায়ী।
জানা যায় এই "নাসির" ভূয়া কবিরাজ "নাঈমে"র আপন ভাই।
কেরানীগঞ্জের তেলঘাট, হিজলতলা ও জিঞ্জারার জনি টাওয়ারে " নাসিরের"পরিচালিত তিনটি দোকান রয়েছে। "নাসির" নিজেকে নেপথ্যে রেখে শুধুমাত্র কর্মচারীর মাধ্যমে এই দোকান পরিচালনা করে আসছে। এই নাসিরের নামেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রয়েছে।
যেখানে হেকিমি ও আয়ুর্বেদীক চিকিৎসা মতে সালশা খাওয়ার একটা পরিমান রয়েছে, যেটা একজন কবিরাজ বা হেকিম রোগীর রোগ নির্নয় করে দিয়ে থাকেন। সেখানে এসব দোকান হতে কিশোর, তরুন ও যুবকরা এক বোতল সালশা কিনে এর সাথে টনিক নামের আরেকটি তরল পানিয় মিশিয়ে বেলেন্ডার করে এক চুমুকেই খেয়ে ফেলে। আয়ুর্বেদীক চিকিৎসকের মতে এরকম মাদক মিশ্রিত "সালশা পিনিক" সেবন করলে শরীরে ক্ষুদামন্দা, শরীরের মাংসপেশি শুকিয়ে যাওয়া, হাত-পা কাপতে থাকা, অধিক দূর্বলতা, কিডনি বিকল হওয়া সহ দেহের অনেক ধরনের জটিল ও কঠিন রোগ হতে পারে। কারন এর মধ্যে তারা ব্যবহার করে অতিমাত্রায় যৌন উত্তেজক উপাদান, উচ্চমাত্রায় সিনথেটিক ক্যফেইন, গাঁজার নির্জাস ও ঘুমের ঔষধ। যৌন উত্তেজকের উপাদান বেশি পরিমান থাকায় পুরুষত্বহীনতাও হতে পারে। তাছাড়া এটি একটি সামাজিক অবক্ষয়।
অপরাধের পর্দার আড়ালে থাকা এই "নাসির" তেলঘাট, হিজলতলা ও জিঞ্জারার জনি টাওয়ারে তার তিনটি দোকানেই এসব ভয়াবহ মাদক "সালশা পিনিকে"র ব্যাবসা করে আসছে নিশ্চিতে নির্বিঘ্নে।
তার নেই কোনো বৈধ কাগজ পত্র।
এ "সালশা পিনিক" বিক্রির বিষয়ে প্রশাসনের নজরধারীর ব্যাপরে কৌশলে জানতে চাইলে দোকান মালিক "নাসির" জানায় আমরা সবকিছু ম্যানেজ করে ব্যাবসা করি।
সবকিছু ম্যানেজ করে না চললে ঢাকার নারিন্দা থেকে এসে কেরানীগঞ্জে ব্যাবসা এতো বড়সড় ভাবে করি কি করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী জানায়, অতি দ্রুত এরকম ভয়ংকর মাদক মিশ্রিত "সালশা পিনিকে"র দোকান বন্ধ না হলে এলাকার কিশোর ও যুব সমাজ ধংস হতে বেশি সময় লাগবেনা।
সচেতন মহলের কিছু লোক জানায়, প্রতিদিন এরকম নেশার টাকা যোগাতে কিশোর, তরুন ও যুব সমাজ চুরি ছিনতাই চাঁদাবাজীর মতো অপরাধ করতে একবারের বেশি দু'বার ভাববেনা।
তাছাড়া কিছু দিনমজুর রিকশা চালক ভ্যান চালক ও অটোচালক তারাও এসব "সালশা পিনিক" পান করে, যার জন্য এদের পরিবারে প্রতিদিনই তৈরি হয় পারিবারিক কলহ।
তাই স্থানীয় ও সচেতন মহল বলেন প্রশাসনের নাকের ডগায় এরকম ভয়ংকর মাদক মিশ্রিত "সালশা পিনিকে"র দোকান তারা পরিচালনা কিভাবে করে আসছে। তাহলে কি প্রশাসন গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে নাকি দেখেও না দেখার মতো।
প্রশাসন যেন বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সহকারে দেখে এবং অতি দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে এই মাদক মিশ্রিত "সালশা পিনিকে"র দোকানগুলো একেবারে বন্ধ করে দেয়া সহ এই মদক মিশ্রিত " সালশা পিনিক" বিক্রেতা "নাসির" ও ভূয়া কবিরাজ "নাঈম" এর সাথে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করে তার জোড় দাবি জানিয়েছেন।