সাইদ গাজী, সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
ফরিদপুরের সালথায় এলাকার আধিপত্য বিস্তার ও স্থানীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গ্রাম্য মোড়লের দ্বন্দ্বের জেরে প্রায়শই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। হামলা ও পাল্টা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হচ্ছে শতশত বসতবাড়ি এবং অন্যান্য স্থাপনা। হামলা, পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষে অসংখ্য মানুষ আহত হচ্ছেন, এর মধ্যে অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করছেন। সম্প্রতি উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের বালিয়া গট্টি বাজার, আড়য়াকান্দী, মিরের গট্টি ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক এই সহিংসতার ঘটনা ঘটছেই চলছে। এসব ঘটনায় একাধিক মামলা ও দুই মোড়ল একাধিকবার জেল খাটলেও এলাকায় শান্তি ফিরে আসছে না। সবশেষ আজ সোমবার (৪ মে) সকালে উপজেলার মিরের গট্টি গ্রামে হামলা চালিয়ে অন্তত ১৫-২০ টি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। গুরুতর আহত হয়েছেন দুইজন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গট্টি ইউনিয়নের আধিপত্য বিস্তার ও এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আড়ুয়াকন্দী গ্রামের ইউপি সদস্য নুরু মাতুব্বরের সাথে বালিয়া গট্টি গ্রামের জাহিদ মাতুব্বরের বিরোধ চলে আসছে। এলাকায় তারা দুই জন গ্রাম্য মোড়ল হিসেবে পরিচিত। একসময় নুরু আর জাহিদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা বিএনপিতে যোগ দিয়ে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠে। যে কারণে আওয়ামী লীগের পতনের পর দুই মোড়লের সমর্থকদের মধ্যে অন্তত ১০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শতশত মানুষ আহত হয়েছে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। সহিংসতার সময় ভাঙচুর করা হয়েছে অন্তত দুই শতাধিক বসতবাড়ি। এমনকি কয়েকটি বাড়িতে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এলাকাবাসী সুত্রে জানাগেছে, চলমান বিরোধের জেরে গত রবিবার দুপুরে নুরু মাতুব্বরের সমর্থক আনোয়ার শেখকে (৩০) পিটিয়ে আহত জাহিদের সমর্থকরা। খবর পেয়ে এ ঘটনার কিছু সময় পর জাহিদের সমর্থক রেজাউলকে মারধর করে নুরু মাতুব্বরের সমর্থকরা। এরপর থেকে দুই মোড়লের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। উভয়পক্ষই সংঘর্ষের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এরই মধ্যে সোমবার সকালে মিরের গট্টি এলাকায় নুরু মাতুব্বরের ছেলে রাজিব মাতুব্বরকে (৩২) কুপিয়ে আহত করে জাহিদের সমর্থকরা। পরে নুরু মাতুব্বর সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে জাহিদের সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে অন্তত ১৫ থেকে ২০টি বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনার পর থেকে উভয়পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোনো সময় বড় ধরণের সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক ও চাকরিজীবি বলেন, গট্টি, বালিয়া, আড়ুয়াকান্দী, মিরের গট্টি ও কানৈড় গ্রামের সাধারন মানুষকে জিম্বি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছেন গ্রাম্য মোড়ল নুরু মাতুব্বর ও জাহিদ মাতুব্বর। এদের সঙ্গে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারন মানুষ গ্রাম্যদল না করলে তাদের এলাকায় বসবাস করা মুসকিল হয়ে পড়ে। এরা দুই মোড়ল এলাকায় সহিংসতা সৃষ্টি করে। পরে সাধারন মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে সংসার চালায়। এদের আর কোনো কাজ নেই। এরা দলপক্ষের নামে সাধারন খেটে খাওয়া মানুষকে শাসন করে। এদের হাত থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। গ্রাম্য এসব মোড়ল একের পর এক সহিংস কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও পুলিশ এদের আইনের আওতায় আনার লক্ষে তেমন ভুমিকা নেয় না। এদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও অজ্ঞাত কারণে আটক করা হয় না। আমরা এসব গ্রাম্য মোড়লদের হাত থেকে মুক্তি চাই।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নুরু মাতুব্বর বলেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জাহিদ ও আজাদ মাতুব্বরের সমর্থকরা আমাদের ১০-১২ জনকে পিটিকে কুপিয়ে পঙ্গু করে ফেলেছে। থানায় অভিযোগ দিলে অভিযোগ নেয়না। পুলিশ তাদের পক্ষে কাজ করে। পুলিশ শক্ত ভুমিকা নিলে এমন পরিস্থিতি ঘটতো না। আজও আমার ছেলেসহ কয়েকজনকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেছে। আমি এর বিচার চাই।
জাহিদ মাতুব্বর বলেন, আমার কোন সমর্থক নেই। আমি এখন নিজেও অসুস্থ। তারপরও আমি আজ থেকে কোন রাজনীতি, মাতুব্বরি কোন ঝুট-ঝামেলার মধ্যে নেই। আমি সবকিছু ছেড়ে আমি আমার পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান বলেন, দুই মাতুব্বরের মধ্যে এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একের পর এক হামলা-মামলা, বাড়ি-ঘর ভাংচুর লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। পুলিশ খবর পেয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরপেক্ষভাবে কঠোর ভুমিকা পালন করছে। এখানে কারো কোন পক্ষ নেওয়া হচ্ছে না। নুরু মাতুব্বরের বক্তব্য সঠিক নয়।
বিষয়টি নিয়ে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. দবির উদ্দীন বলেন, এলাকায় শান্তির লক্ষে সহিংসতায় জড়িত মোড়লদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারন মানুষ যাতে শান্তিতে বসবাস করতে পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। আমরা এলাকার পরিবেশ ভাল রাখতে উভয়পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। কোনোভাবেই এলাকা অশান্তকারীদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।