আবু বকর ছিদ্দিক নোয়াখালীঃ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে গত দুই বছর থেকে নিখোঁজ ছিলেন উপজেলার জয়াগ গ্রামের মৃ'ত আবুল কালাম আজাদের দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা বেগম (৩২) ও তার ছেলে মো.নোমান (৯)। রোববার (২৪ মে) দুপুরে সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ গ্রামের আবু আমিনের বাড়ির পুকুর থেকে তাদের ক'ঙ্কাল দুটি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহত নারীর দুই সৎ ছেলে ও এক নাতি সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজু (৪০), জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর (৪৫), আশিকুর রহমান টিপু (৩২) গ্রে'প্তার করা হয়েছে। এক কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তির বিরোধের জেরে হ'ত্যা করে পরিকল্পিত ভাবে লা'শ গু'ম করা হয়। ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় উপজেলা জুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে চাঞ্চল্যকর ক্লুলেস এই মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে সিআইডি, নোয়াখালী ইউনিট। একটি মোবাইলের সূত্র ধরে পরতে পরতে অনুসন্ধান, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, জিজ্ঞাসাবাদ অবশেষে উন্মোচিত হয় হ'ত্যা রহস্য। সিআইডির বর্ণনায় লো'মহর্ষক সেই ঘটনার নানা তথ্য উঠে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত: সিআইডি জানায়, ২০১২ সালের দিকে বিধবা কমলা খাতুন নতুন করে সংসার জীবনে পা রাখেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন বিপত্নীক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে। দু’জনেরই এটি ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। সেই সংসারকে পরিপূর্ণ করে জন্ম নেয় তাদের পুত্র সন্তান নোমান।
অন্যদিকে আবুল কালাম আজাদের প্রথম পক্ষের সংসারে ছিল পাঁচ ছেলে, যাদের মধ্যে তিনজন এখন জীবিত। সময়ের সাথে সাথে বড় হতে থাকে পরিবারটি। সৎ সন্তান, তাদের স্ত্রী-সন্তান এবং নিজের সন্তানকে নিয়ে কমলা খাতুন ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।
প্রায় সাত-আট বছর আগে আবুল কালাম আজাদের মৃ'ত্যু হলে দায়িত্ব আরও বেড়ে যায় কমলা খাতুনের । স্বামীর মৃ'ত্যুর পরও কমলা খাতুন তার একমাত্র ছেলে নোমান এবং সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে শান্তিপূর্ণভাবেই বসবাস করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই বদলে যায় সবকিছু। ২০২৪ সালের ১০ মার্চ, ভিকটিমের সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ৯ মার্চ থেকে তাদের সৎ মা নিখোঁ'জ রয়েছেন এবং মোবাইল ফোনেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
এ খবর পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ছুটে আসেন কমলা খাতুনের ছোট বোন রহিমা বেগম। তিনি এসে সৎ ছেলে জিয়াউর রহমান সাগর ও সাইফুল ইসলাম রাজন রাজুকে তার বোন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তারাও কমলা খাতুনকে খুঁজে পাচ্ছেন না বলে জানান। এ বিষয়ে তারা থানায় জিডিও করা হয়েছে বলে তথ্য দেন।
তবে রহিমা বেগম তাদের কথায় পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি। বোনের হঠাৎ নিখোঁ'জ হওয়ার ঘটনায় তিনি কোনো স্বাভাবিকতা খুঁজে পাননি। অবশেষে নিজেই বাদী হয়ে ১৪ মার্চ ২০২৪ তারিখে নোয়াখালীর নারী ও শিশু নির্যা'তন দ'মন ট্রাইব্যুনাল-২ এ একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। সেখানে সাগর(৩৫), রাজু (৩০), শ্যামলী (৪৫) ও কাজল (৩৮) নামীয় চার জনকে সন্দেহভাজন বিবাদী করা হয়।
অনুসন্ধানের সূচনা: বিজ্ঞ আদালত প্রথমে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), নোয়াখালীকে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। পরে আরও গভীর অনুসন্ধানের জন্য মামলাটি সিআইডি নোয়াখালীকে হস্তান্তর করা হয়। এরপর শুরু হয় সন্তানসহ এক নিখোঁজ নারীর রহস্য উদ্ঘাটনের দীর্ঘ অনুসন্ধান।
প্রায় তিন মাস ধরে নানা অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ ও সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পর অবশেষে ২০২৪ সালের ৪ জুন সিআইডির অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত সোনাইমুড়ী থানায় একটি নিয়মিত মামলার নির্দেশ দেন। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যা'তন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধনী ২০০৩) এর ৭/৩০ ধারায় রুজু হয় এবং তদন্তভার দেওয়া হয় সিআইডিকে।
অপহ'রণ মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম: আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় অপ'হরণ মামলার তদন্ত কার্যক্রম। তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে সিআইডি জানতে পারে, মৃত্যুর আগে আবুল কালাম আজাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা খাতুন এবং তাদের একমাত্র শিশু সন্তান নোমানের নামে বসতবাড়িসহ সংলগ্ন প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দিয়েছিলেন। বর্তমান বাজারমূল্যে যার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই সম্পত্তিকে কেন্দ্র করেই দীর্ঘদিন ধরে প্রথম সংসারের সন্তানদের সঙ্গে বিরো'ধ চলে আসছিল। মামলায় অভিযুক্ত জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর বিদেশ থেকে দেশে ফিরে সম্পত্তি নিজেদের নামে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য কমলা খাতুনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। এছাড়া একটি জমি বিক্রির টাকা ভাগ-বাটোয়ারা নিয়েও সৎমা ও সৎ সন্তানদের মধ্যে তীব্র বি'রোধ সৃষ্টি হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে অভিযুক্তরা কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানকে মা'রধর করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়। সেই ঘটনার পর থেকেই মা ও ছেলেকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
নিহ'তের মোবাইল দেখালো পথ: এক ব্যক্তির কাছ থেকে ভিকটিম কমলা খাতুনের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করতে সক্ষম হয় সিআইডি। জিজ্ঞাসাবাদে সিআইডি জানতে পারে, মোবাইল ফোনটি ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল। পরে সিআইডি ওই বাসা এবং এর ভাড়াটিয়াদের তথ্য বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে। সিআইডি জানতে পারে, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি সাইফুল ইসলাম রাজন রাজু একসময় ওই বাসাতেই ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করতেন।
আসামী গ্রেফ'তার ও খু'নের লোমহর্ষক তথ্য:
দীর্ঘ তদন্ত ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অবশেষে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। সিআইডি নোয়াখালীর একটি চৌকস আভিযানিক দল এলআইসি, সিআইডির সহায়তায় গোপন তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ২১ মে রাতে ময়মনসিংহের কোতোয়ালী থানার ভাটিকাশর এলাকা থেকে আসামি সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজু (৪০)-কে গ্রেফ'তার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফ'তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন, ২২ মে সন্ধ্যায় সোনাইমুড়ী জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে আরেক আসামি জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর (৪৫) এবং তদন্তে উঠে আসা সহযোগী অভিযুক্ত আশিকুর রহমান টিপু (৩২)কে গ্রেফ'তার করা হয়।
পরবর্তীতে আদালতের অনুমতিতে তিন দিনের রিমা'ন্ডে এনে তাদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে এক ভয়াবহ ও শিউরে ওঠার মতো হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্তরা স্বীকার করে যে, সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে ঘটনার প্রায় পনেরো দিন আগেই তারা হ'ত্যার পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাড়ির পাশের পুকুরপাড়ে আগেই একটি গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়, যাতে হ'ত্যার পর লা'শ গোপনে মাটিচা'পা দেওয়া যায়।
যে ভাবে হ'ত্যা করা হয় দু'জনকে: ২০২৪ সালের পহেলা মার্চ রাতে কমলা খাতুন ও তার শিশু ছেলে নোমানের খাবারের পানির সঙ্গে ঘু'মের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে তারা অচেতন হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে অভিযুক্তরা ঘরে প্রবেশ করে। এরপর গলায় গামছা পেঁ'চিয়ে, হাত দিয়ে গলা চে'পে এবং বালিশ চাপা দিয়ে শ্বা'সরোধ করে মা ও শিশুপুত্রকে হ'ত্যা করা হয়। হ'ত্যার পর অপ'রাধের কোনো চিহ্ন যাতে না থাকে, সেজন্য তারা ভিকটিমদের পরনের কাপড় খু'লে ফেলে এবং পূর্বপ্রস্তুত জায়গায় লা'শ দুটি পুঁ'তে রাখে। পরে ব্যবহৃত গামছা ও পরিধেয় কাপড় আগু'নে পু'ড়িয়ে ফেলে আলা'মত ন'ষ্ট করার চেষ্টা করা হয়।
পুকুরের পানি সেচে ক'ঙ্কাল উদ্ধার: আসামীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রবিবার সকালে অভিযান চালায় সিআইডি। তারা জয়াগ গ্রামের আবু আমিনের বাড়ির পুকুরের পানি সেচে ভেকুর সাহায্যে মাটি খুঁড়ে ভিকটিম কমলা খাতুন ও শিশু নোমানের দে'হাবশেষ উদ্ধার করে।