এম এইচ মুন্না:
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বোরি) ঘিরে দীর্ঘ সাত মাস ধরে পরিচালিত দৈনিক গণতদন্তে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর টনক নড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক ভয়ভীতি, স্বজনপ্রীতি, সরকারি সম্পদের ব্যক্তিগত ব্যবহার, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের। সেই অনুসন্ধান প্রকাশের পর মহাপরিচালক কমোডর মো. মিনারুল হককে সরিয়ে দেওয়া হলেও বোরির রউফ-জাকারিয়ার সিন্ডিকেট বহাল তবিয়তে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় একটি অংশের অভিযোগ, মহাপরিচালকের বদলি কেবল দৃশ্যমান পরিবর্তন। কিন্তু যে প্রশাসনিক ও আর্থিক বলয়কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে বোরিতে নানা অভিযোগ জন্ম নিয়েছে, সেই বলয়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রউফ তালুকদার এবং সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার জাকারিয়া এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।
দৈনিক গণতদন্তের হাতে থাকা নথিপত্র, টেন্ডার ডকুমেন্ট, বিল-ভাউচার, প্রকল্প ফাইল, প্রশাসনিক আদেশ, আর্থিক হিসাব এবং সংশ্লিষ্টদের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে বোরির অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প, ক্রয় কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই দুই কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বোরির দ্বিতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্পে অনুমোদিত প্রকল্প পরিচালক (পিডি) এবং সহকারী প্রকল্প পরিচালক (এপিডি) নিয়োগের ক্ষেত্রে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। বিধিমালার নির্ধারিত কাঠামো পাশ কাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত দায়িত্বের আড়ালে প্রকল্প পরিচালনার অভিযোগ ওঠে। সেই বিতর্কের কেন্দ্রেও ছিল রউফ-জাকারিয়া জুটি।
অভিযোগ রয়েছে, ই-জিপি, এলটিএম ও আরএফকিউ পদ্ধতির বিপুল সংখ্যক ক্রয় কার্যক্রমে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। অনুসন্ধানে ঘুরেফিরে এসেছে কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন, প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট করে একই গোষ্ঠীকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে নেপথ্যে সক্রিয় ছিলেন প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তা, যাদের মধ্যে আব্দুর রউফ তালুকদারের নাম সবচেয়ে বেশি এসেছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত জনবল কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রাখা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নতুন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ হলে দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে এগোতে দেওয়া হয়নি।
বোরির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে এমন একটি অদৃশ্য ক্ষমতা কাঠামো গড়ে উঠেছিল যেখানে প্রশাসনিকভাবে মহাপরিচালক থাকলেও প্রকল্প ও আর্থিক সিদ্ধান্তের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ছিল জাকারিয়া-রউফের হাতে।
মিনারুল হকের বদলির পরও সেই বাস্তবতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলমান প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ যাতে নতুন প্রশাসনের হাতে পুরোপুরি না যায়, সে জন্য এখনও বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে বোরির অভ্যন্তরে আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চলমান প্রকল্পের দায়িত্ব ও প্রভাব ধরে রাখতে মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন ধরনের আবেদন ও তদবিরের প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন কোনো প্রশাসনিক নেতৃত্ব দায়িত্ব নিয়ে প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক নথিপত্র গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে গত কয়েক বছরের অনেক অজানা তথ্য সামনে চলে আসতে পারে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, সহকারী প্রকৌশলী আব্দুর রউফ তালুকদার ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য একটি আবেদনপত্র প্রস্তুত করছেন। সেখানে বোরি ও চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন অসমাপ্ত কাজ, প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বার্থের কথা উল্লেখ করে বর্তমান প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, আবেদনপত্রে এমন যুক্তিও উপস্থাপন করা হচ্ছে যে, মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বে না থাকলেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রকল্প পরিচালককে দায়িত্বে রাখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্পের দায়িত্ব নতুন কারও কাছে হস্তান্তর হলে গত কয়েক বছরের বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর্থিক লেনদেন, টেন্ডার কার্যক্রম, যানবাহন ব্যবহার, জ্বালানি ব্যয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নতুন করে পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর এ কারণেই বিদায়ী নেতৃত্বের একটি অংশ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অনাগ্রহী বলে অভিযোগ উঠেছে।
বোরির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মহাপরিচালকের বদলির পরও তার ঘনিষ্ঠ প্রশাসনিক বলয় ভাঙেনি। বরং প্রকল্পের মাধ্যমে সেই প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। তাদের দাবি, আব্দুর রউফ তালুকদার যে আবেদনপত্র প্রস্তুত করছেন, সেটি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেই করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে আব্দুর রউফ তালুকদার ও জাকারিয়ার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।