এম এইচ মুন্না
বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর মহাপরিচালক (ডিজি) পরিবর্তনকে ঘিরে এমন এক প্রশাসনিক গোলকধাঁধার সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রতিটি স্তর উন্মোচিত হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব হস্তান্তরের স্বচ্ছতা, সরকারি প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা, নির্বাহী ক্ষমতার বৈধতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে বিস্তর প্রশ্নের জন্ম নিতে পারে।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে দায়িত্বের শেষ দিন একরকম, বাস্তবতায় অবস্থান আরেকরকম; দায়িত্ব হস্তান্তরের নথিতে একাধিকবার স্বাক্ষরের অভিযোগ, মাঝখানে আট দিনের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা, আর সেই রহস্য কাটার আগেই নতুন মহাপরিচালকের প্রথম কর্মদিবসে চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত, সব মিলিয়ে বোরির প্রশাসনিক অন্দরে কী ঘটেছিল, সেই প্রশ্ন এখন সংশ্লিষ্ট মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
দৈনিক গণতদন্ত- এর হাতে আসা সরকারি প্রজ্ঞাপন ও অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া মন্ত্রণালয়ের আদেশে তৎকালীন মহাপরিচালক কমডোর মো. মিনারুল হক (এইচ), ওএসপি, বিসিজিএম, পিএসসি, বিএন-এর সর্বশেষ কর্মদিবস নির্ধারণ করা হয় ১৮ জুন। একই দিনে পৃথক আদেশে বোরির মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় যুগ্মসচিব মো. মিজানুর রহমানকে।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কমডোর মিনারুল হক ২১ জুন সন্ধ্যা পর্যন্ত বোরি ক্যাম্পাসে অবস্থান করেন। শুধু অবস্থানই নয়, দায়িত্ব হস্তান্তরের নথিতেও স্বাক্ষর করেন বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কক্সবাজার বিমানবন্দরের পথে থাকা অবস্থায় তিনি জানতে পারেন যে বোরির নতুন মহাপরিচালক হিসেবে নৌবাহিনীর আরেক কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন। এরপর তিনি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাকে ফোন করে দায়িত্ব হস্তান্তরের নথি সংশোধনের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই নির্দেশের পর নথিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, নবনিযুক্ত মহাপরিচালক কমডোর শেখ শাহীদ আহমেদ (এইচ-১), এনপিপি, পিএসসি, বিএন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করার। একই দিনে সাবেক মহাপরিচালক কমডোর মিনারুল হক আবারও বোরি ক্যাম্পাসে এসে দায়িত্ব হস্তান্তরের নথিতে পুনরায় স্বাক্ষর করেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। একটি দায়িত্ব হস্তান্তরের নথিতে দ্বিতীয়বার স্বাক্ষরের প্রয়োজন কেন? প্রথম নথি কি অসম্পূর্ণ ছিল, নাকি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে সেটি পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল? যদি পরিবর্তন হয়ে থাকে, তাহলে তা কার নির্দেশে এবং কোন আইনগত ভিত্তিতে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক সচিব দৈনিক গণতদন্তকে বলেন, “যদি ১৮ জুনই সাবেক মহাপরিচালকের দায়িত্ব শেষ হয়ে থাকে এবং একই দিনে যুগ্মসচিবকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ১৯ জুন থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত বোরির বৈধ প্রশাসনিক প্রধান কে ছিলেন, এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
তিনি আরও বলেন, “এই সময়ের মধ্যে ফাইল অনুমোদন, আর্থিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক আদেশ, সরকারি নথিতে স্বাক্ষর কিংবা নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ, সবই আইনগতভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ প্রশাসনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ধারাবাহিক বৈধ কর্তৃত্ব; সেখানে যদি অস্পষ্টতা থাকে, তাহলে পুরো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।”
এর মধ্যেই নতুন মহাপরিচালক দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই এক কর্মকর্তার চাকরিচ্যুতির আদেশে স্বাক্ষর করেছেন বলে জানা গেছে। ফলে প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন, যে প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব হস্তান্তরের বৈধতা নিয়েই বিতর্ক, সেখানে গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর প্রক্রিয়াগত ভিত্তিও কি স্বাধীনভাবে যাচাই করা উচিত নয়?
এবিষয়ে সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউটের মহাপরিচালক কমডোর শেখ শাহীদ আহমেদ (এইচ-১), এনপিপি, পিএসসি, বিএন- এর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।