এম এইচ মুন্না:
কক্সবাজারের রামুতে অবস্থিত বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বোরি) তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) ও অতিরিক্ত সচিব জনাব সাঈদ মাহমুদ হেলাল হায়দারের (বেলাল) ক্ষমতার অন্ধমহলে ঠিক এমনই এক নারকীয় অধ্যায় রচিত হয়েছিল। কিন্তু ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নির্মম পরিহাস হলো, এই বর্বরোচিত ঘটনার পর বিচার পাওয়া তো দূরের কথা, সুগভীর আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে উল্টো সাবেক ডিজি বেলালের ‘বলির পাঁঠা’ বনে গেছেন নির্যাতিতা বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিপাশা সুর। বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ঘটনার পর দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এই লোমহর্ষক অপরাধের কোনো দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ বা উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত হয়নি। বিচারের সমস্ত দুয়ার যখন এক অদৃশ্য হাত দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হলো, তখন চরম ক্ষোভ, ঘৃণা আর তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ধুঁকতে ধুঁকতে এই মেধাবী কর্মকর্তা তাঁর স্বপ্নের চাকরিটিই শুধু ছাড়েননি, বরং চিরতরে মাতৃভূমি বিসর্জন দিয়ে লন্ডনে পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছেন।
২০২৩ সালের ১৬ মার্চ, সকাল ঠিক ৯টায় বোরির তৎকালীন ডিজি সাঈদ মাহমুদ হেলাল হায়দার তাঁর কার্যালয়ে এক পরিকল্পিত ফাঁদ পাতেন। কক্ষের বাইরে মোতায়েন করা হয় ছয়জন সশস্ত্র আনসার সদস্য। তরুণী কর্মকর্তা বিপাশা সুর কক্ষে প্রবেশ করা মাত্রই ভেতর থেকে দরজা লক করে দেওয়া হয়। কোনো নারী সহকর্মীর উপস্থিতি না রেখে সম্পূর্ণ পুরুষবেষ্টিত সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষে যে মনস্তাত্ত্বিক টর্চার সেল তৈরি করা হয়েছিল, তা যেকোনো সভ্য সমাজকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। স্রেফ সংবাদমাধ্যমে ডিজির দুর্নীতির খবর প্রকাশের সন্দেহে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই বিপাশা সুরকে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা জেরা ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উক্ত কক্ষে ডিজি বেলালের সহযোগী হিসেবে উপস্থিত থেকে এই মানসিক নির্যাতনে সরাসরি অংশ নেন প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার জনাব সাঈদ মুহাম্মদ শরীফ, সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার আবু শরীফ মো: মাহবুব-ই-কিবরিয়া, সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার তরিকুল ইসলাম এবং প্রশাসনিক বিভাগের সহকারী পরিচালক রনি আব্বাস হাওলাদার। এছাড়া কক্ষে মো: মাঈনুদ্দীন হাসান সাহেদ ও আজিম নিহাদ নামে দুজন রহস্যময় বহিরাগত মিডিয়াকর্মীও উপস্থিত ছিলেন, যাদের সামনেই চলে এই বর্বরতা। কক্ষে বসিয়ে তৎকালীন ডিজি বেলাল তাঁর পূর্বতন কর্মস্থল টেকনাফ ও কক্সবাজারের নির্বাহী কর্মকর্তা থাকাকালীন ক্ষমতার গল্প শোনানো শুরু করেন, কিভাবে মানুষ সেখানে গুম হয়ে যেত, কিভাবে রেজুরখালে অগণিত গলিত-অর্ধগলিত লাশ ভেসে উঠতো।
একজন তরুণী কর্মকর্তাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য এই ভয়ংকর প্রচ্ছন্ন হুমকিই ছিল প্রথম চাল। নির্যাতনের মাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি; তৎকালীন ডিজির নির্দেশে তাঁর সহযোগী তরিকুল ইসলাম বিপাশা সুরের সাথে অশোভন আচরণ শুরু করেন এবং তাঁর গায়ে হাত দিয়ে বিনা অনুমতিতে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে গোপন পাসওয়ার্ড দিতে বাধ্য করেন। এরপর সেই কক্ষে থাকা অজ্ঞাতনামা দুই বহিরাগত ব্যক্তি ফোনের ভেতর প্রবেশ করে তাঁর ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য হাতিয়ে নেয় এবং সবার সামনে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল মন্তব্য করতে থাকে, যা সরাসরি সাইবার ও প্রাতিষ্ঠানিক হ্যারাসমেন্টের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ। এক পর্যায়ে চরম বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক রূপ ধারণ করে এই জেরা।
পিতৃহীন এই নারী কর্মকর্তাকে "সংখ্যালঘু ও অভিভাবকহীন" বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় এবং তাঁকে "ভারতীয় সংস্থার এজেন্ট" আখ্যা দিয়ে চাকরিচ্যুত করার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি তাঁর বিভাগীয় প্রধান জনাব মো: আবুল কাসেমের সাথে তাঁর অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে বলে চরম নোংরা ও ভিত্তিহীন অপবাদ দিয়ে চরিত্রহননের সব সীমানা পার করা হয়। সেই সাথে সীমা রানী, হানিফ বিশ্বাস, আবদুল্লাহ আল মামুন সিদ্দীকি, সিনথিয়া তৌহিদী এবং তানিয়া রহমানসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার সাথে মিলে ডিজির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক গোপন মিটিং করার বানোয়াট অভিযোগ তোলা হয়। টানা নির্যাতনের শেষ পর্যায়ে যখন বিপাশা সুর তাদের সাজানো বানোয়াট অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান, তখন ডিজি বেলাল চরম পৈশাচিকতায় গর্জে উঠে বলেন যে, তাঁকে বাঁচিয়ে রেখে লাভ নেই, গবেষণা কেন্দ্রে অলরেডি দুটি কবর খোঁড়া হয়ে গেছে যার মধ্যে একটি তাঁর জন্য। এখানেই শেষ নয়, নিজের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে তিনি হুমকি দেন যে তাঁর অস্ত্রে তিনটা বুলেটের একটি বিপাশা সুরের জন্য ব্যবহার করবেন। মৃত্যু আর কবরের এই প্রত্যক্ষ বিভীষিকার সামনে অবরুদ্ধ এক নিঃসঙ্গ নারীর পক্ষে প্রাণ বাঁচানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে তিনি তৎকালীন ডিজির তৈরি করা বানোয়াট অভিযোগপত্রে স্বাক্ষর দিয়ে দুপুর ১২টার দিকে সেই নরককুণ্ড থেকে মুক্তি পান। এই নারকীয় ট্রমার পর ঢাকার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে, যেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে "একিউট স্ট্রেস ডিসঅর্ডার"-এর মতো গুরুতর মানসিক আঘাতের সনদ দেন। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ঘটনার পর; একজন প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা স্বয়ং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর এই সুনির্দিষ্ট ও লোমহর্ষক বিবরণী জমা দিয়ে জীবনের নিরাপত্তা এবং বিভাগীয় তদন্তের আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন প্রভাবশালী অতিরিক্ত সচিব সাঈদ মাহমুদ হেলাল হায়দার বেলালের ক্ষমতার খুঁটি এতই শক্ত ছিল যে, মন্ত্রণালয়ের আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেট এই পুরো ফাইলটি চেপে যায়। কোনো সুষ্ঠু তদন্ত তো হয়ইনি, উল্টো অপরাধীদের বহাল তবিয়তে আড়াল করা হয়েছে। বিচারের বাণী যখন এভাবে নীরবে নিভৃতে কেঁদে বিদায় নেয়, তখন একজন মেধাবী কর্মকর্তার সামনে দেশ ও চাকরি ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
বোরির একাধিক কমকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাবেক এই বিতর্কিত ডিজির ক্ষমতার অপব্যবহার, দাপ্তরিক গুন্ডামি এবং নারী সহকর্মীর ওপর চালিত এই বর্বরোচিত সহিংসতার ফাইলটি পুনরায় খুলে একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি করা খুবই দরকার। যাতে বিপাশা সুরদের মতো কাউকে জন্মভূমি ও চাকরি ছেড়ে দেশ ত্যাগ করতে না হয়।
এ বিষয়ে জানতে অভিযোগে নাম থাকা সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার সাঈদ মুহাম্মদ শরীফ-এর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানের একাধিক সূত্রের দাবি, তিনি তৎকালীন ডিজি সাঈদ মাহমুদ হেলাল হায়দারের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া দৈনিক গণতদন্তকে বলেন, "আমার কাজই হলো ডিজি স্যারদের প্রশাসনিক কাজে সহযোগিতা করা। সেদিনও আমি ডিজি স্যারের নির্দেশে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তবে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি।" তাঁর সঙ্গে তৎকালীন ডিজির পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "অনেকে মনে করেন আমি সাবেক ডিজির শ্যালক। বিষয়টি সঠিক নয়। তাঁর শ্বশুরবাড়ি রংপুরে এবং আমার বাড়িও রংপুর হওয়ায় হয়তো এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী আমার খালাতো বোন বা নিকটাত্মীয় নন। শুধু রংপুরে বিয়ে করলেই কেউ আমার দুলাভাই হয়ে যায় না। আমি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি।"
সিনিয়র সাইন্টিফিক অফিসার তরিকুল ইসলাম দৈনিক গণতদন্তকে বলেন, "সেদিন আমি ডিজি স্যারের নির্দেশে সেখানে উপস্থিত ছিলাম। ডিজি স্যারের নির্দেশের বাইরে আমাদের যাওয়ার সুযোগ থাকে না। আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সঠিক নয়। আমি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছি।"
অভিযোগে নাম থাকা প্রশাসনিক বিভাগের সহকারী পরিচালক রনি আব্বাস হাওলাদার-এর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেন, দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়ম ও বিতর্কের অভিযোগে তাঁর নাম প্রায়ই আলোচনায় এসেছে।
লিখিত অভিযোগকারী বিপাশা সুর-এর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি অজ্ঞাত কারণে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে অভিযোগে উল্লেখিত তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান মো. আবুল কাসেম দৈনিক গণতদন্তকে বলেন, সেদিন যা ঘটেছে তা সিনেমাকে ও হার মানায়। বিগত ১৬/০৩/২০২৩ ইং তারিখের ঘটনা বরির জন্য কলঙ্কজনক ইতিহাস। সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনা উন্মোচন করলে প্রতিষ্ঠান কলঙ্কমুক্ত হবে।তদন্তাধীন বিষয়ে আর কোন মন্তব্য করতে চাইনা।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট (বোরি)-এর তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) ও অতিরিক্ত সচিব সাঈদ মাহমুদ হেলাল হায়দার (বেলাল)-এর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।