লালমনিরহাট প্রতিনিধি -
মোঃ রব্বানী ইসলাম
এক সময় ভারতীয় পাথরে মুখর থাকত লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর। সারিবদ্ধ ট্রাক, শ্রমিকদের ব্যস্ততা, ব্যবসায়ীদের কর্মচাঞ্চল্য আর আমদানি-রপ্তানির কোলাহলে জমজমাট থাকত পুরো এলাকা। কিন্তু গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে ভারত থেকে পাথর আমদানি কার্যত বন্ধ থাকায় দেশের অন্যতম রাজস্ব আদায়কারী এই স্থলবন্দর এখন অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। ভারতীয় পাথরের সংকটে ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হওয়া পণ্যের মধ্যে স্টোন, বোল্ডার ও চিপস উল্লেখযোগ্য। আগে ভারতীয় ট্রাকগুলোতে প্রতি গাড়িতে ৫০ থেকে ৬০ টন পর্যন্ত পাথর আসত। এতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম খরচে বেশি পরিমাণ পাথর পেতেন। তবে সম্প্রতি ভারত সরকার ওভারলোডিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে ট্রাকপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ টন পাথর পরিবহনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। ফলে আগের মতো অতিরিক্ত পাথর বহনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে দর-কষাকষি ও আলোচনার জটিলতার কারণে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা পাথর রপ্তানি কার্যক্রম স্থগিত রেখেছেন। অন্যদিকে বেশি দামে পাথর কিনতে আগ্রহী নন বাংলাদেশি আমদানিকারকরাও। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বুড়িমারী স্থলবন্দরে ভারতীয় পাথরের আমদানি বন্ধ রয়েছে।
ভারতীয় পাথরের সংকটের সুযোগে বেড়ে গেছে ভুটান থেকে আমদানি হওয়া পাথরের দাম। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভুটান আগে থেকেই নির্ধারিত ওজন মেনে পাথর রপ্তানি করে আসছে। বর্তমানে ভুটানের তোর্শা এলাকা থেকে প্রতি টন পাথরের আমদানি মূল্য ১৫ ডলার এবং সামসি এলাকা থেকে ১৪ ডলার নির্ধারিত রয়েছে।
দুই-তিন মাস আগেও ভুটানের পাথর বাংলাদেশে বিক্রি হতো প্রতি টন ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৭৫০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব পাথর ভেঙে বাজারজাত করতে অতিরিক্ত শ্রম, মেশিন ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক ব্যবসায়ী ধীরে ধীরে এই বন্দরমুখী ব্যবসা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
শুধু পাথর সংকটই নয়, সিন্ডিকেট, জায়গা সংকট, মহাসড়কে চাঁদাবাজি এবং সড়কের বেহাল অবস্থার মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাও বন্দরের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, এসব সমস্যা সমাধান না হলে রাজস্ব আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়বে না।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮৬ কোটি ৫ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭ কোটি ৮৪ হাজার টাকায়। আর ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৯০ কোটি ৬৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে যেসব পণ্য রপ্তানি হয়, তার মধ্যে কিছু পণ্য মাসে একবার কিংবা ১৫ দিন পরপর সীমিত আকারে পাঠানো হচ্ছে। এসব পণ্যের রপ্তানি আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। উল্লেখযোগ্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে গার্মেন্টস পণ্য, জুট ও জুটজাত পণ্য, প্রাণ গ্রুপের বিভিন্ন খাদ্যপণ্য, হাটিলের ফার্নিচার, মেলামাইন সামগ্রী এবং বিভিন্ন ধরনের এনার্জি ড্রিংকস। তবে বর্তমানে এসব পণ্যও নিয়মিতভাবে না গিয়ে নির্দিষ্ট সময় পরপর সীমিত পরিমাণে ভারতে যাচ্ছে, ফলে আগের তুলনায় চাহিদা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমেও কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকার পাথর ব্যবসায়ী ইলিয়াস আলী তুহিন বলেন, অনেক দিন ধরে আমাদের দেশে ভারতীয় পাথর আসছে না। ওভারলোডিং বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশে কোনো গাড়ি পাথর নিয়ে আসতে পারছে না। ভুটানের পাথরের দামও অনেক বেড়ে গেছে। যে দামে পাথর কিনে আনছি, সেই দামে দেশের বাজারে বিক্রি করতে পারছি না। এতে আমরা ক্ষতির মুখে পড়েছি। বুড়িমারীর অনেক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভারত থেকে আগের মতো গাড়ি না আসা পর্যন্ত বন্দরের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের কাস্টমস ও ক্লিয়ারিং-ফরওয়ার্ডিং এজেন্টদের সংগঠনের সভাপতি ফারুক হোসেন বলেন, ভারতের বিভিন্ন কোয়ারি ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নতুন করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে ভারতীয় সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত দুই দেশের মধ্যে পাথর বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক হবে।
এদিকে বুড়িমারী স্থলবন্দরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী কমিশনার মতলেবুর রহমান বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমাদের রাজস্ব আদায় ছিল প্রায় ৮৭ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯০ কোটিতে পৌঁছেছে, প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে ভারতীয় পাথর আমদানি বন্ধ থাকায় প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায়ে কিছুটা প্রভাব পড়েছে।
স্থানীয়দের মতে, ভারতীয় ভিসা জটিলতা, পাথর আমদানি বন্ধ এবং মৌসুমি ফল আমদানির ভাটা,সব মিলিয়ে একসময়ের কর্মচঞ্চল বুড়িমারী স্থলবন্দর এখন অনেকটাই নীরব। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি হাজারো মানুষের জীবিকাও আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি/ মোঃ রব্বানী ইসলাম
তারিখ; ০৬-০৭-২০২৬_