এম এইচ মুন্না:
বিগত ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী শাসনামলের অবসান ঘটলেও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দোসরদের মূলোৎপাটন তো দূরের কথা, উল্টো তাদের রহস্যজনক পুনর্বাসন ও বিতর্কিত পদায়নকে কেন্দ্র করে ময়মনসিংহ রেঞ্জজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন বিতর্ক ও তীব্র ক্ষোভ। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মাধ্যমে অর্জিত দ্বিতীয় স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য যখন বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, তখন খোদ পুলিশ বাহিনীর ভেতরেই ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মাদের পুনর্বহাল প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
মাঠপর্যায়ে পুলিশি কার্যক্রমকে পুরোপুরি সচল ও জনবান্ধব করার চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তর এবং রেঞ্জ প্রশাসন এখন ব্যস্ত সময় পার করছে একচেটিয়া বদলি, পদোন্নতি ও পদায়নের গোপন লবিং নিয়ে। আর এই সুযোগে গোয়েন্দা রিপোর্ট বা যোগ্যতার তোয়াক্কা না করে, বিগত ১৬ বছর ধরে চরম বঞ্চনার শিকার হওয়া দেশপ্রেমিক পুলিশ কর্মকর্তাদের সাইডলাইন করে রাখা হচ্ছে। তড়িঘড়ি করে মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বসানো হচ্ছে সেই ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদেরই, যা নিয়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে খোদ বাহিনীর ভেতরেই।
দৈনিক গণতদন্তের অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সারা দেশের থানাগুলোতে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে প্রায় ৭০০ জন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কর্মরত রয়েছেন। গত জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে যে পাশবিক জুলুম ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, তার সিংহভাগই সম্পন্ন হয়েছিল আওয়ামী শাসনামলে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া এই সমস্ত ওসিদের প্রত্যক্ষ কমান্ড ও নেতৃত্বে। আন্দোলনের পর সারা দেশের গুটি কয়েকটি জায়গায় নামমাত্র কয়েকজন ওসিকে বদলি করা হলেও, অধিকাংশ ওসিই এক অদৃশ্য খুঁটির জোরে তাদের পূর্বের জায়গায় বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন। অনেকে আবার এক জেলা থেকে অন্য জেলায় একই সমান্তরালে গুরুত্বপূর্ণ থানার মসনদ ভাগিয়ে নিচ্ছেন।
‘দৈনিক গণতদন্ত’-এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, বর্তমানের এই বদলি ও পদোন্নতির তালিকায় কেবল তথাকথিত ‘বঞ্চিতরাই’ আসছেন না, বরং এর পেছনে কাজ করছে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং উচ্চপর্যায়ের নানামুখী তদবির। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুষ ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে পূর্বের সুবিধাভোগীদেরই পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদ পাইয়ে দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী পুলিশ পরিদর্শক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “থানার ওসি পদায়নে এখনো তদবির ও অর্থ লেনদেনের চরম প্রভাব রয়েছে। এতে করে আগের সুবিধাভোগীরাই আবারও গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন। অথচ যারা চরম প্রতিকূল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের অনেককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা পেশাদার কর্মকর্তাদের মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে দিচ্ছে।” আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ছাত্রদল-সংশ্লিষ্টতার তকমা থাকা বা সৎ ও আদর্শবান হিসেবে পরিচিত অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।
প্রশাসনের এই নীতিবিবর্জিত ও বৈষম্যমূলক আচরণের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে ময়মনসিংহ রেঞ্জ এবং তার আশপাশের জেলাগুলোতে। রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় থেকে সম্প্রতি কোনো প্রকার যৌক্তিক কারণ ছাড়া একযোগে ৩০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গণবদলি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা স্পষ্ট দাবি করেছেন, এই বদলি কোনো প্রকৃত প্রশাসনিক প্রয়োজনে বা চেইন অব কমান্ড ঠিক করতে করা হয়নি; বরং নির্দিষ্ট একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যে এই প্রশাসনিক চাল চাল হয়েছে। এই গণবদলির কোপানলে পড়েছেন কিশোরগঞ্জের এসআই (নিঃ) ওয়াহিদিল্লাহ সজীব, টাঙ্গাইলের এএসআই (নিঃ) শামীম, ময়মনসিংহের এএসআই (নিঃ) শহিদুল ইসলাম, কনস্টেবল জায়সী মাজহার, নরসিংদীর নায়েক জাকির হোসেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কনস্টেবল মোঃ আবিদ হাসান, নেত্রকোনার নারী কনস্টেবল সৈয়দা পাপিয়া সুলতানা সাথী, শেরপুরের কনস্টেবল সুলতান এবং ময়মনসিংহের কনস্টেবল জাকির হোসেন, কনস্টেবল মোঃ রাসেল মাহমুদ ও কনস্টেবল মোঃ শফিকুল ইসলামসহ আরও অনেকে। এই পাইকারি বদলিকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও টার্গেটেড উল্লেখ করে জামালপুর জেলা ছাত্রদল নেতা সেলিম শাহরিয়ার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “জামালপুর জেলার কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্টভাবে টার্গেটে পরিণত করে বদলি করা হচ্ছে। এতে তাদের পেশাগত জীবনের চরম ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে এবং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র কাজ করছে।” এঘটনায় মনির চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে ওসিদের পতন করছে ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া। ডিআইজি আতাউল কিবরিয়া ঘুষ ছাড়া কোন ওসি পদায়ন করেন না। মনির চৌধুরী বলেন, আমি একটা মামলা করেছি। ওসি আসামি গ্রেফতার করে না।
যাচাই-বাছাইহীন এই বিতর্কিত পদায়ন এবং একপেশে প্রশাসনিক পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। অপরাধীরা মাথার ওপর পুরোনো ও অনুগত কর্মকর্তাদের ফিরে পেয়ে পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফ্যাসিবাদের দোসরদের এই প্রকাশ্য পুনর্বাসন দেশের দ্বিতীয় স্বাধীনতার মূল চেতনাকে ব্যাহত করবে এবং পুলিশ বাহিনীর ভেতরকার পেশাদার শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।