লালমনিরহাট প্রতিনিধি;
মোঃ রব্বানী ইসলাম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লালমনিরহাট বিমানবন্দর। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত প্রায় ১,১৬৬ একর জমির ওপর বিশাল এই স্থাপনাটি এক সময় মিত্রবাহিনীর দাপুটে সামরিক ঘাঁটি ছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই বিমানবন্দর এখন কৃষকদের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের চাষাবাদ এবং লিজ নিয়ে এখন তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। রানওয়ের নিরাপত্তা ও বেড়া নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিমানবাহিনী এবং স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মুখোমুখি অবস্থান।
১৯৩১ সালে নির্মিত এই বিমানবন্দরটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্রবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর এটি পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। ১৯৮৭ সালে বিমানবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আসার পর থেকে এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পায় লালমনিরহাট বিমানবাহিনী ইউনিট।
বিমানবন্দরটি অব্যবহৃত থাকায় স্থানীয় কৃষকরা দীর্ঘকাল ধরে এর আশপাশের জমি লিজ নিয়ে চাষাবাদ করে আসছেন। শুরুতে প্রতি শতক জমির লিজ মূল্য ছিল মাত্র আড়াই টাকা, যা পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ টাকায়। কৃষকরা নিয়মিত এই সরকারি ফি পরিশোধ করে আসছিলেন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে 'এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়' নির্মাণের কথা বলে তাদের কাছ থেকে ২৩ একরের বেশি জমি ফেরত নেওয়া হয়। কৃষকদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, এই প্রতিষ্ঠানে তাদের সন্তানদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।
কৃষক আখতারুজ্জামান বাদশা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হবে, চাকরি পাবো,এই আশায় আমরা জমি দিয়েছিলাম। কিন্তু আদতে আমাদের সন্তানরা চাকরি পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়টি যতটুকু জমি ব্যবহার করছে, বাকি জমি চড়া মূল্যে বহিরাগতদের লিজ দেওয়া হয়েছে। এটি আমাদের সাথে প্রতারণা।
বর্তমানে বিমানবাহিনীর ১০২ একর জমি ৩০২ জন কৃষকের কাছে লিজ দেওয়া আছে। সম্প্রতি নিরাপত্তার অজুহাতে বিমানবাহিনী কর্তৃপক্ষ পুরো রানওয়ে এলাকা ও লিজকৃত জমি ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু করেছে। এতে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।
রবিবার (১২ জুলাই) দুপুরে রানওয়ের সামনে রংপুর-লালমনিরহাট মহাসড়কে শত শত কৃষক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ করে বেড়া নির্মাণ করা হচ্ছে, যা তাদের চাষাবাদের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
মানববন্ধনে কৃষক মানিক মিয়া বলেন, আমরা প্রতি বছর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী লিজের টাকা পরিশোধ করছি। হঠাৎ শুনছি এই জমি বহিরাগতদের লিজ দেওয়া হবে। আমাদের দাবি স্পষ্ট,যতদিন বিমানবন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু না হচ্ছে, ততদিন আমরাই এখানে চাষাবাদ করব। রানওয়ে চালু হলে আমরা স্বেচ্ছায় জমি ছেড়ে দেব।
কৃষকদের আরেকটি বড় অভিযোগ, স্থানীয়দের অন্ধকারে রেখে বহিরাগতদের কাছে চড়া মূল্যে জমি লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তারা বলছেন, বিমানবাহিনী কর্তৃপক্ষ তাদের সাথে কোনো আলোচনা না করেই জমি দখল বা বেড়া নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে দীর্ঘদিনের লিজ গ্রহীতারা তাদের আয়ের উৎস হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
দীর্ঘদিনের লালিত এই বিমানবন্দরটি দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে পারবে,এমনটাই প্রত্যাশা ছিল এলাকাবাসীর। কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রকল্পের ছায়ায় এখন সাধারণ কৃষকের অস্তিত্বের সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। রানওয়ে সচল হওয়ার আগ পর্যন্ত এ বিতর্কিত জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও বিমানবাহিনী কর্তৃপক্ষের রেষারেষি এখন তুঙ্গে।
তবে রানওয়ে এবং প্যারা নির্মাণের বিষয় কর্তৃপক্ষ সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, আইএসপি আর এর অনুমোদন ছাড়া কোন ধরনের বলতে রাজি না।
প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না, তা নিয়ে এখন জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি/ মোঃ রব্বানী ইসলাম
তারিখ-১২ জুলাই ২০২৬ ইং