মো.হাইউল উদ্দিন খান,গাজীপুর প্রতিনিধি
গাজীপুর মহানগরের বাসন থানার পালেরপাড়া এলাকায় পোশাক শ্রমিক মিম আক্তারকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি তার স্বামী মো. আলম হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার
(৩০ জুলাই) ভোর সাড়ে ৫টার দিকে বরিশাল মহানগরের কোতোয়ালি থানার লঞ্চঘাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পিবিআইয়ের দাবি, স্ত্রীকে হত্যার পর আলম হোসেন গাজীপুর থেকে পালিয়ে বরিশাল লঞ্চঘাট ব্যবহার করে অন্যত্র যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তবে পিবিআইয়ের তদন্ত দল তার অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার ও পিবিআই গাজীপুর জেলার ইউনিট ইনচার্জ মো. রকিবুল আক্তার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নিহত মিম আক্তার (২৮) ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার মাঝিয়াইল গ্রামের মো. জয়নাল আবেদীনের মেয়ে। তিনি গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। প্রায় ছয় বছর আগে ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী আলম হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাদের মেরাজ নামে তিন বছর বয়সী একটি সন্তান রয়েছে।স্বামী-সন্তান নিয়ে তারা বাসন থানার পালেরপাড়া এলাকায় আরজু মিয়ার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৫ জুলাই মিম তার বেতনের ৫ হাজার টাকা বাসার ড্রয়ারে রাখেন। অভিযোগ রয়েছে, ২৭ জুলাই রাতে তার স্বামী ওই টাকা নিয়ে জুয়া খেলেন এবং টাকা হারিয়ে ফেলেন। পরে মিম ওষুধ কেনার জন্য টাকা খুঁজে না পেয়ে স্বামীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি টাকা নিয়ে জুয়া খেলার কথা স্বীকার করেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও মারামারি হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বামীর ভয়ে মিম একই এলাকায় বসবাসকারী তার বোন মোসা. লাকীর বাসায় আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতেই আলম হোসেন ও তার মা মোসা. জাহানারা বেগম সেখানে গিয়ে মিমকে আবার ভাড়া বাসায় ফিরিয়ে আনেন।
এরপর মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) রাত ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে মিম ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তাকে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয় বলে মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে তার মাথা, কপাল, মুখমণ্ডল, বুক ও পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। পরে গলা কেটে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোরে খবর পেয়ে নিহতের ভাই মো. শহীদুল ইসলাম ওরফে রানা ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশকে খবর দেন। পরে বাসন থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে আলম হোসেন ও তার মা মোসা. জাহানারা বেগমকে আসামি করে বাসন থানায় হত্যা মামলা করেন।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই পিবিআই গাজীপুর জেলার ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। পাশাপাশি শুরু হয় ছায়া তদন্ত। মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ৩০ জুলাই সংস্থাটি স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করে। পুলিশ পরিদর্শক মো. রাফিকুল ইসলাম জামানকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
পিবিআই জানায়, পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের দিকনির্দেশনা এবং গাজীপুর জেলার ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তারের তত্ত্বাবধানে একাধিক দল আসামিকে গ্রেপ্তারে কাজ শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে বরিশাল লঞ্চঘাট এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আলম হোসেন অটোরিকশাচালক বলে জানা গেছে। কোমরের হাড়ের সমস্যার কারণে তিনি নিয়মিত অটোরিকশা চালাতে পারতেন না। এতে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট চলছিল। পিবিআইয়ের দাবি, তিনি মাদকাসক্ত ও জুয়ায় অভ্যস্ত ছিলেন। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, মাদক ও জুয়ার আসক্তি এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ থেকেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে তদন্ত সংস্থা।
তবে পিবিআই বলছে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং কারা এতে জড়িত ছিলেন তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার মো. রকিবুল আক্তার বলেন, হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই পিবিআইয়ের ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পাশাপাশি ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় তদন্ত দল বিরামহীনভাবে কাজ করে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মামলার প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি জানান, অভিযান সফল করতে পিবিআই বরিশাল জেলা, পিবিআই সদর দপ্তর, ঢাকা ও বরিশাল নৌ পুলিশ এবং বরিশাল মহানগর পুলিশ সহযোগিতা করেছে।
গ্রেপ্তার আলম হোসেনকে বৃহস্পতিবার আদালতে সোপর্দ করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। মামলার অপর আসামি জাহানারা বেগমকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পিবিআই।