মোঃ আনিসুর রহমান শেলী

:
জীবিকার সন্ধানে একসময় সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন শামীম আল মামুন। তবে প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেই টেলিভিশনের পর্দায় দেখা একটি কোয়েল খামার বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। দেশে ফিরে নিজেই গড়ে তোলেন কোয়েলের খামার। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে সেই উদ্যোগ এখন পরিণত হয়েছে সফল ব্যবসায়।
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামের বাসিন্দা শামীম আল মামুন স্থানীয়ভাবে ‘কোয়েল শামীম’ নামে পরিচিত। তার প্রতিষ্ঠিত ‘সোনার বাংলা কোয়েল হ্যাচারি’ থেকে প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ কোয়েলের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
শামীম আল মামুন জানান, ২০০৯ সালে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি পানির কারখানায় চাকরি করতেন তিনি। এক রাতে কাজ শেষে টেলিভিশনে চ্যানেল আইয়ের কৃষিভিত্তিক একটি অনুষ্ঠান দেখেন। সেখানে একটি কোয়েল খামারের সফলতার গল্প তার নজর কাড়ে। অনুষ্ঠানটি দেখে দেশে ফিরে কোয়েল খামার করার সিদ্ধান্ত নেন। তখন থেকেই ভবিষ্যৎ খামারের নামও ঠিক করেন—‘সোনার বাংলা কোয়েল খামার’।
২০১১ সালে প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে প্রথমে ওই খামারটি পরিদর্শন করেন। পরে অভিজ্ঞ খামারিদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিয়ে ২০১২ সালের শুরুর দিকে বাড়ির পাশে প্রায় ২০ শতাংশ জমিতে খামার গড়ে তোলেন। শুরুতে বগুড়া থেকে আনা ৫০০টি কোয়েলের বাচ্চা দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি।
শুরুতে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চললেও ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়তে থাকে। মাত্র তিন বছরের মধ্যে কোয়েলের সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে যায়। তার সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন জেলার খামারিরা তার খামার পরিদর্শনে আসতে শুরু করেন।
২০২০ সাল পর্যন্ত কোয়েল ও ডিম বিক্রি করে ভালোভাবেই চলছিল ব্যবসা। তবে করোনাকালে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। অনেক খামারি ব্যবসা গুটিয়ে নিলেও শামীম হাল ছাড়েননি। নতুন সম্ভাবনার কথা চিন্তা করে ২০২৩ সালে কোয়েল হ্যাচারি চালু করেন। এরপর থেকেই ব্যবসায় নতুন গতি আসে।
বর্তমানে তার খামারে প্রায় ১৬ হাজার প্রজননক্ষম মা কোয়েল রয়েছে। প্রতিদিন এসব কোয়েল থেকে ১০ থেকে ১২ হাজার হ্যাচিং ডিম সংগ্রহ করা হয়। হ্যাচারিতে ১৭ দিন পর এসব ডিম থেকে কোয়েলের বাচ্চা ফুটে বের হয়। প্রতি মাসে প্রায় দুই লাখ বাচ্চা উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন জেলার খামারিদের কাছে সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি বাচ্চা ৭ থেকে ৮ টাকা দরে বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে খামার থেকে তার মাসিক আয় প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা।
শামীম আল মামুন বলেন, ‘এ ব্যবসাই এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়। ব্যবসার পাশাপাশি আনন্দও পাই। ভালো আয় হচ্ছে, পাশাপাশি অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারছি। আমার সফলতা দেখে সখীপুরে অনেকেই কোয়েল খামার গড়ে তুলেছেন।’
তিনি আরও বলেন, কোয়েল পালন পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক একটি খাত। এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে আরও অনেক বেকার তরুণ-তরুণী স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাইফুর রহমান বলেন, কোয়েল পালন পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক একটি খাত। এর ডিম ও মাংস পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং কোয়েলের পরিপালন ব্যয়ও তুলনামূলক কম। শামীম আল মামুন একজন অনুসরণীয় সফল উদ্যোক্তা। তার উদ্যোগ অন্যদেরও উৎসাহিত করছে।