ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি :
গ্যাস সঙ্কটে প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিএল) আধুনিকায়নের মাধ্যমে দ্রুত সচল করা এবং এর পূর্বনাম ‘আশুগঞ্জ জিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড’ পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল করেছেন কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীরা। দাবি বাস্তবায়ন না হলে স্থলপথ, নৌপথ ও রেলপথ অবরোধসহ কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আশুগঞ্জ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল প্লাজা এলাকায় এএফসিএল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের উদ্যোগে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন ও সমাবেশ শেষে শ্রমিক-কর্মচারীরা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
কর্মসূচিতে কারখানার শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তাদের দাবির সাথে সংহতি প্রকাশ করে আশুগঞ্জ উপজেলা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এছাড়া সিএনজি, ট্রাক ও রিকশা মালিক সমিতি এবং আশুগঞ্জ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সিবিএর নেতাকর্মীরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আশুগঞ্জ সার কারখানা শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি আশুগঞ্জের শিল্প, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দীর্ঘদিন কারখানাটি বন্ধ থাকায় শ্রমিক-কর্মচারীদের পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
তারা অভিযোগ করেন, ২০১০ সালের পর থেকে একটি ব্যবসায়ী মহল দেশীয় সার কারখানাগুলো বন্ধ রেখে বিদেশ থেকে সার আমদানির সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলো আর্থিক ও যান্ত্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বক্তারা বলেন, দেশের সব সার কারখানা আধুনিকায়নের মাধ্যমে সচল করা গেলে সার উৎপাদনে বাংলাদেশ অনেকটাই স্বনির্ভর হতে পারে। যেখানে দেশে তুলনামূলক কম খরচে সার উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে, সেখানে জনগণের করের টাকা ব্যয় করে বেশি দামে বিদেশ থেকে সার আমদানি করা কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়।
তাদের দাবি, সার কারখানার জমি রাষ্ট্রের মালিকানায় রেখে সার শিল্পের স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। জমি লিজ দেয়ার যে উদ্যোগ বা পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পুরোনো কারখানাটিকে গ্যাস সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে আধুনিকায়ন করে চালু করতে হবে অথবা একই স্থানে নতুন একটি আধুনিক সার কারখানা স্থাপন করতে হবে
মানববন্ধন থেকে ‘শিল্প বাঁচাও, কর্মসংস্থান বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ এবং ‘সার কারখানা বাঁচাও, সার শিল্পে স্বনির্ভরতা বাড়াও’—এমন বিভিন্ন স্লোগান দেয়া হয়।
বক্তারা আরো বলেন, আন্তর্জাতিক সঙ্কট ও যুদ্ধের কারণে গ্যাস ও সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশে সারের দাম বেড়ে যায়। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় সার উৎপাদন বাড়ানোই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
জিয়া ফার্টিলাইজার’ নাম পুনর্বহালের দাবি
মানববন্ধনে আশুগঞ্জ সার কারখানার পূর্বনাম পুনর্বহালের দাবিও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এ প্রতিষ্ঠানটির নাম পুনরায় ‘আশুগঞ্জ জিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড’ করা হোক।
একই সাথে শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করে দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
গ্যাস সঙ্কটে গত বছরের ১ মার্চ থেকে আশুগঞ্জ সার কারখানায় ইউরিয়া উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কারখানাটিতে বর্তমানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার ১০০ টন ইউরিয়া উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। পূর্ণ সক্ষমতায় কারখানা চালু রাখতে প্রতিদিন প্রায় ৪৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
উৎপাদন বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কোটি টাকার সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দেশের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে আমদানি করা সার দিয়ে ডিলার ও কৃষকদের চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে। একই সাথে দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানার মূল্যবান যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
১৯৮৩ সালে বাণিজ্যিকভাবে ইউরিয়া উৎপাদন শুরু হয় আশুগঞ্জ সার কারখানায়। শুরুর দিকে প্রতিদিন প্রায়েএক হাজার ৬০০ টন সার উৎপাদন হলেও সময়ের সাথে উৎপাদন সক্ষমতা কমে বর্তমানে প্রায় এক হাজার ১০০ টনে নেমেছে। গত কয়েক বছর ধরেই গ্যাস সঙ্কটের কারণে বছরের বড় একটি সময় কারখানাটিতে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে।
আশুগঞ্জ সার কারখানা শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু কাউসার বলেন, ‘কারখানাটি এখনো উৎপাদনে সক্ষম। যখনই অল্প সময়ের জন্য গ্যাস সরবরাহ করা হয়, তখন উৎপাদনের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। সেগুলো মেরামত করে কারখানা চালুর উদ্যোগ নেয়ার সময় আবার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করা হলে আশুগঞ্জ সার কারখানাকে এখনো লাভজনক করা সম্ভব। রাষ্ট্রায়ত্ত ও কৃষিসংশ্লিষ্ট এ প্রতিষ্ঠানটি বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’
আশুগঞ্জ সার কারখানার উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘গ্যাস সঙ্কটের কারণেই কারখানাটি চালু করা যাচ্ছে না। গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলে দ্রুত উৎপাদনে ফেরার প্রস্তুতি রয়েছে। কম গ্যাসে উৎপাদন করা যায়—এমন প্রযুক্তি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করছে। পাশাপাশি আশুগঞ্জে নতুন সার কারখানা স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।’
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (সঞ্চালন) মোহাম্মদ বাপ্পি শাহরিয়ার বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলেই আশুগঞ্জ সার কারখানায় পুনরায় গ্যাস সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। তবে গ্যাস সরবরাহের জন্য তারা