নার্গিস রুবি: রাজধানীর দ্রুত বর্ধনশীল পূর্ব ভাষানটেক এলাকায় অননুমোদিত ও ব্যত্যয়কৃত ভবন নির্মাণের বিরুদ্ধে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে রাজউক। অভিযানে ছয়টি ভবনকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়; দুইটি ভবনের বিদ্যুৎ মিটার কেটে নেওয়া হয় এবং সব কয়টি ভবনের মালিকের কাছ থেকে এক মাসের মধ্যে ব্যত্যয়কৃত অংশ অপসারণের লিখিত মুচলেকা সংগ্রহ করা হয়। কিছু ভবনের ব্যত্যয়কৃত অংশের আংশিক অপসারণ অভিযানের সময়ই সম্পন্ন হয়; বাকি অংশ মালিকরা নিজ দায়িত্বে ও নিজ খরচে ভেঙে ফেলার অঙ্গীকার করেছেন।
অভিযানে অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ, ইমারত পরিদর্শক শরীফ এবং জোন ৩/১-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শান্তা রহমান নেতৃত্ব দেন।
অভিযান-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শান্তা রহমান বলেন, "আমরা ছয়টি ভবনে অনুমোদনের বাইরে নির্মাণ পেয়েছি। দুই ভবনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। সব মালিকের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয়েছে, এক মাসের মধ্যে ব্যত্যয়কৃত অংশ অপসারণ করতে হবে। সময়সীমার মধ্যে প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না; জরিমানা, সিলিং, এমনকি বাহিনী দিয়ে জোরপূর্বক ভাঙনসহ পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ বলেন, "মিটার কাটা ও মুচলেকা আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। ভবন নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩(১) ধারা অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কোনো সংযোজন বা পরিবর্তনই বৈধ নয়।"
উচ্ছেদের মুখে পড়া এক ভবন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "নকশার সঙ্গে সামান্য ব্যত্যয় হয়েছিল, তাৎক্ষণিকভাবে অংশবিশেষ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ আমরা নিজেরাই এক মাসের মধ্যে সরিয়ে ফেলব যেন ভবনের বাসিন্দারা কোনো ভোগান্তিতে না পড়েন।" অন্য এক মালিক বলেন, "ভবিষ্যতে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ীই কাজ করব, যাতে আর এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়।"
আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবন নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩বি ধারায় লঙ্ঘন ধরা পড়লে কমপক্ষে সাত দিনের শো-কজ নোটিশের পর অপসারণের নির্দেশ দেওয়া যায়, আর ধারা ৬ অনুযায়ী নোটিশ অমান্য করলে বলপ্রয়োগ করে ভবন খালি করানোর বিধান আছে। অনুমোদন ছাড়া নির্মাণের ক্ষেত্রে ১২ ধারায় সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও অন্যূন ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে এবং মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত হওয়ায় এ অপরাধ মোবাইল কোর্টেও বিচার্য। অর্থাৎ ভাষানটেকের এই অভিযান শুধু প্রশাসনিক উদ্যোগ নয়, আইনের সরাসরি বাস্তবায়ন।
প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এ অভিযানের তাৎপর্য আরও স্পষ্ট। ড্যাপের ভৌত জরিপ অনুযায়ী ঢাকা মহানগর এলাকায় ২১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি স্থাপনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই অনুমোদনহীন বা শর্তভঙ্গ করে নির্মিত। আইন অনুযায়ী ব্যত্যয়কৃত অংশ জরিমানা দিয়ে বৈধ করার সুযোগ নেই, অপসারণই একমাত্র পথ। বাস্তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এর আগেও ধারাবাহিকভাবে এমন অভিযান চালিয়েছে; ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোহাম্মদপুরের রমচন্দ্রপুর খাল দখল করে নির্মিত ১০ তলা অবৈধ ভবন বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছিল মেয়র আতিকুল ইসলামের নেতৃত্বে।
পূর্ব ভাষানটেকের প্রেক্ষাপটও ভিন্ন নয়। আবাসিক চাহিদা ও ভাড়াটিয়া জনসংখ্যার চাপে এখানে মূল অনুমোদিত প্ল্যানের বাইরে অতিরিক্ত তলা, বারান্দা সম্প্রসারণ বা ব্যবহার পরিবর্তনের প্রবণতা দেখা যায়, যা শুধু নগর পরিকল্পনা ভঙ্গ করে না, ভূকম্প ও অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকিও বাড়ায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এক মাসের সময়সীমা পার হলে দ্বিতীয় পর্যায়ের কঠোর অভিযানে সরাসরি ভাঙন বা সম্পূর্ণ সিলিংয়ের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং একই এলাকার অন্যান্য সন্দেহজনক ভবনের তালিকা তৈরি করে ধারাবাহিক অভিযান চলবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ভবন নির্মাণের বিধিমালা ঠিক থাকলেও বাস্তবায়ন ও তদারকির ঘাটতি ব্যাপক অগ্নিদুর্ঘটনায় পুড়ে যাওয়া ভবনগুলোর প্রায় সবই ইমারত বিধিমালার বাস্তবায়ন ছাড়া চলে। তাই উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা: ভবন কেনার বা ভাড়া নেওয়ার আগে অনুমোদিত প্ল্যান ও সিটি করপোরেশনের অনুমোদন যাচাই করা জরুরি; মালিকের মুচলেকা আইনি নিরাপত্তা দেয় না। কারণ সময়সীমা পার হলে অসুবিধায় পড়তে পারেন ভবনের মালিকের পাশাপাশি সাধারণ ভাড়াটিয়া ও ব্যবসায়ীরাও।