1. info@dainikgonatadanta.com : দৈনিক গণতদন্ত :
বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৮ অপরাহ্ন
বিজ্ঞাপন:
জরুরী নিয়োগ চলছে, দেশের প্রতিটি বিভাগীয় প্রতিনিধি, জেলা,উপজেলা, স্টাফ রিপোর্টার, বিশেষ প্রতিনিধি, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি, ক্যাম্পাস ও বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি বা সাংবাদিক নিয়োগ চলছে।

কাস্টম-ভ্যাটের পদায়ন সিন্ডিকেটের কবলে এনবিআর

রিপোর্টারের নাম :
  • প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১৭৪ বার পড়া হয়েছে

 

 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখন যেনো রাজস্ব সংগ্রহের প্রতিষ্ঠানের বদলে একদল ক্ষমতালোভী কর্মকর্তার হাতের পুতুল। কাস্টমস-ভ্যাট প্রশাসনের পদায়ন আজ আর নিয়মনীতি বা নীতিমালার ওপর নির্ভর করে না; বরং গুটিকয় কর্মকর্তা ও তাদের গঠিত ‘বলয় সিন্ডিকেট’-এর মর্জিতেই নির্ধারিত হয় কার ভাগ্যে কোন পদ, আর কে নির্বাসিত হবে রাজ্যের প্রান্তে।

সিপাহি থেকে শুরু করে কমিশনার পর্যন্ত- পদায়নের প্রতিটি ধাপেই এখন দৃশ্যমান এক ভয়ঙ্কর ছায়াশাসন। সংশ্লিষ্ট কমিশনারদের অভ্যন্তরীণ আদেশ জারি করার ক্ষমতা থাকলেও, বাস্তবে তাদের কলম থমকে যায় উপরের নির্দেশে। কোন কর্মকর্তাকে কোন ডিভিশনে বা কাস্টম হাউসের কোন গ্রুপে পাঠানো হবে, তা নির্ধারণ হয়ে যায় এক অদৃশ্য টেলিফোন নির্দেশে। ‘অপছন্দের কর্মকর্তা’রা পাঠানো হয় নন-ফাংশনাল দপ্তরে, আর ‘বিশ্বস্ত বলয়ের সদস্যরা’ পান ঢাকার কেন্দ্রীয় ও লাভজনক পদ। এমনকি বন্ধের সময়েও ঢাকায় না ঢোকার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

এনবিআরের আন্দোলনকেও এই সিন্ডিকেট ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। আন্দোলনের নামে প্রতিপক্ষ কর্মকর্তাদের সাময়িক বরখাস্ত ও শাস্তিমূলক বদলির মাধ্যমে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ভয়ের রাজনীতি’।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা মো. মোয়াজ্জেম হোসেন সদস্য পদে পদোন্নতি পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় এই ক্ষমতার কুৎসিত খেলা। সদ্য ওএসডি হওয়া মোহাম্মদ বেলাল হোসেন চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে তিনি দ্রুত নিজের বলয় গঠন শুরু করেন। রপ্তানি ও বন্ড বিভাগের দায়িত্ব পাওয়ার পর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে প্রথমেই সরিয়ে দেন শুল্ক ও ভ্যাট প্রশাসনের প্রথম সচিব আমীমুল ইহসানকে। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় ঘনিষ্ঠ ২৮ ব্যাচের এক কর্মকর্তাকে, যিনি ঢাকা কাস্টম হাউসে নানা বিতর্কের কারণে তিন মাসের মধ্যেই স্ট্যান্ড রিলিজ হয়েছিলেন। কিন্তু সিন্ডিকেটের সুবিধাজনক জায়গা তৈরির জন্য তাকেই এনে বসানো হয় এনবিআরের প্রশাসনের কৌশলগত পদে।

এরপর ধাপে ধাপে প্রশাসনের দ্বিতীয় সচিব থেকে শুরু করে কম্পিউটার অপারেটর পর্যন্ত সব বদলি করা হয়। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের গণবদলি ঘটলেও, একই আন্দোলনে অংশ নেওয়া বলয়ভুক্ত কর্মকর্তারা পুরস্কৃত হন ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে।

এভাবেই এনবিআর সদর দফতর থেকে মাঠপর্যায়ের দপ্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই পদায়ন সিন্ডিকেটের শিকড়। উদাহরণস্বরূপ: চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে নেতৃত্বদানকারী কিছু কর্মকর্তা আন্দোলনের সময় বিতর্কে জড়িয়েও বরং পুরস্কার হিসেবে আরও গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন। অথচ একই ঘটনায় অন্য কর্মকর্তারা সাময়িক বরখাস্তের মুখে পড়েছেন।

দ্বিতীয় সচিবের সাম্প্রতিক বদলি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শুল্ক ও ভ্যাট প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন কালবেলাকে বলেন, সিক্রেসি না মানায় তাকে বদলি করা হয়েছে।কিন্তু প্রশাসনিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ‘সিক্রেসি লঙ্ঘন’-এর কোনও প্রমাণ নেই; বরং প্রকৃত কারণ ছিল পদায়ন সিন্ডিকেটের স্বার্থরক্ষা।

আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরেও। চট্টগ্রাম থেকে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের এনে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এমনকি সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদের চাচাতো ভাইকেও গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে, যা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের এক নগ্ন উদাহরণ। অন্যদিকে, এই বলয়ের বাইরে থাকা এক অতিরিক্ত কমিশনারকে মাত্র দুই দিন পরই এনবিআরে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়; প্রকৃত কারণ, তিনি বলয়ের ‘অন্য’ দলে।

এই সিন্ডিকেট শুধু ঢাকায় নয়, বন্ড কমিশনারেট, কাস্টম গোয়েন্দা, এমনকি সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (CIC) পর্যন্ত বিস্তৃত। বলয়ের বাইরে থাকা কিংবা প্রশাসনের অনুগত না হওয়া বহু কর্মকর্তা কোনও কারণ ছাড়াই শাস্তিমূলক বদলি বা সাময়িক বরখাস্তের শিকার হয়েছেন।

এনবিআরের অভ্যন্তরীণ বদলি-নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, ‘ক’ ক্যাটাগরির কর্মকর্তা সাধারণত ‘খ’ ক্যাটাগরিতে যেতে পারেন, কিন্তু ‘খ’ থেকে ‘গ’ বা ‘ঘ’ ক্যাটাগরিতে পাঠানো যাবে না। এই নিয়ম ভঙ্গ করে নির্বিচারে কর্মকর্তাদের “শাস্তিমূলক নির্বাসন” দেওয়া হচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

রাজস্ব কর্মকর্তা থেকে শুরু করে যুগ্ম কমিশনার! সবাই এখন এক আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কর্মকর্তাদের বক্তব্য, “মোয়াজ্জেম-বেলাল বলয়ের অংশ না হলে এনবিআরে টিকে থাকা দুঃসাধ্য।” কেউ কেউ জানিয়েছেন, ‘ভালো কাজ’ করেও তাঁরা সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন, কারণ তাঁরা স্রোতের বিপরীতে ছিলেন।

আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এখনও প্রায় ৩০০ জন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা পদায়নের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু কারা কবে কোথায় যাবেন, তা নির্ধারণ করছে না কোনও প্রশাসনিক বোর্ড বরং একটি গোপন কক্ষ, কয়েকটি ফোনকল, আর এক ব্যক্তির সঙ্কীর্ণ ক্ষমতালিপ্সা।

এনবিআর যেনো রাজস্ব আহরণের পরিবর্তে ‘পদায়ন ব্যবসার মহাকেন্দ্রে’ পরিনত হয়েছে। রাজস্ব প্রশাসন যেনো এখন প্রশাসনিক আতঙ্কে জর্জরিত। যে সংস্থা দেশের অর্থনীতির শিরা-উপশিরায় অক্সিজেন সরবরাহের কথা, সেখানে এখন ছড়িয়ে পড়েছে দুর্নীতির এক নিঃশ্বাসরুদ্ধ পরিবেশ।

লেখক:
এম এইচ মুন্না
প্রধান সম্পাদক | দৈনিক গণতদন্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন
প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট