
৬টি আসনে ৩৫ প্রার্থী!
মোঃ হাইউল উদ্দিন খান,গাজীপুর প্রতিনিধি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গাজীপুর এখন রাজনীতির উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দু। জেলার ৬টি সংসদীয় আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়েছেন ৩৫ জন। অর্থাৎ প্রতিটি আসনে গড়ে প্রায় ৬ জন করে প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশী। এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলোতে একক প্রার্থী ঘোষণা হওয়ায় বিএনপির অভ্যন্তরে মনোনয়ন দৌড় এখন তুঙ্গে।
কেন্দ্র থেকে ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার পর থেকেই প্রার্থীরা মাঠে অবস্থান মজবুত করতে শুরু করেছেন। ফলে মহানগর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপ ও প্রচারণার প্রতিযোগিতা। গুলশানে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ইতোমধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও সিনিয়র নেতারা মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তারা সবাইকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন,প্রতিটি আসনে মনোনয়ন পাবেন কেবল একজন, বাকিরা তাকে সমর্থন করবেন। তবুও গাজীপুরজুড়ে চলছে তীব্র কৌতূহল,ধানের শীষ কার হাতে উঠবে?
গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর–সদর আংশিক):
৫ নেতার প্রতিযোগিতা—
এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ৫ জন। প্রধান আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল, যিনি জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সদস্য সচিব ছিলেন।
তার পাশাপাশি রয়েছেন ড. ব্যারিস্টার চৌধুরী ইসরাক সিদ্দিকী, শ্রম বিষয়ক সহসম্পাদক মো. হুমায়ুন কবির খান, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মেয়র মজিবুর রহমান, এবং কালিয়াকৈর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ভিপি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।এ আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন নিয়ে চলছে ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিযোগিতা। অপেক্ষায় থাকতে হবে চূড়ান্ত মনোনীত প্রার্থী কে হবেন দেখতে।
গাজীপুর-২ (গাজীপুর মহানগর–বাসন–বাড়িয়া): সর্বাধিক ৯ প্রার্থী–
সবচেয়ে বেশি মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছেন এই আসনে। গাজীপুর মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার ও সাধারণ সম্পাদক এম মঞ্জুরুল করিম রনি সাবেক সহ-সভাপতি আফজাল হোসেন কায়সার ও বিএনপি নেতা হান্নান মিয়া হান্নু রয়েছেন আলোচনায় শীর্ষে।
এছাড়া বাসন মেট্রো থানার সভাপতি তানভীর সিরাজ, সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন চৌধুরী, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন শাহীন, ডা. মাজহারুল আলম, হাসিবুর রহমান খান মুন্না প্রার্থিতায় রয়েছেন।এই আসনকেই বিএনপির “সবচেয়ে জটিল” মনোনয়ন লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর–সদর আংশিক): ৮ প্রার্থীর মুখোমুখি লড়াই—-
এ আসনে মাঠে রয়েছেন ডা. এস. এম. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, মো. আক্তারুল আলম মাস্টার, ডা. সফিকুল ইসলাম, ফরিদা জাহান সপ্না, আতাউর রহমান মোল্লা, সাখাওত হোসেন সবুজ, পিরজাদা রুহুল আমিন ও ব্যারিস্টার পারভেজ। লন্ডন প্রবাসী ব্যারিস্টার পারভেজ ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক বাচ্চু ও আক্তারুল আলম মাস্টার এই আসনে আলোচনায় শীর্ষে।তবে কেন্দ্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় এখানেও ধোঁয়াশা কাটেনি।
গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া): পরিবারভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব—-
এ আসনে ৪ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী।ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহ’র ছোট ছেলে শাহ রিয়াজুল হান্নান, মো. সাখাওয়াত হোসেন সেলিম, ড. আবুল হাসেম খান চৌধুরী, ও সফিউল্লাহ মিঠু—এ চারজনের মধ্যে সিদ্ধান্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।রাজনৈতিক সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় কমিটির নিকট সম্পর্কের কারণে শাহ রিয়াজুল হান্নানের সম্ভাবনাই বেশি।
গাজীপুর-৫ (কালীগঞ্জ–পূবাইল আংশিক): একক প্রার্থী মিলন
এই আসনে বিএনপির একমাত্র প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক মিলন।
তাকে ঘিরে কালীগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠ কার্যত একপক্ষীয়।তবে জামায়াতে ইসলামী এখানে খায়রুল হাসানকে প্রার্থী করছে, যিনি স্থানীয়ভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
এ আসনে ভোটযুদ্ধ মূলত জামায়াত বনাম বিএনপি—দুই ঐতিহ্যবাহী শরিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটাররা।তবে কালীগঞ্জের আজম খানও জয়-পরাজয় নির্ধারণে বিশেষ শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে বলে ধারণা করছেন ভোটারেরা।
গাজীপুর-৬ (টঙ্গী পূর্ব–পশ্চিম–পূবাইল আংশিক): সিনিয়র বনাম তরুণদের লড়াই—
নতুনভাবে সংযোজিত এই আসনে ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।শীর্ষে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা হাসান উদ্দিন সরকার, যিনি দীর্ঘদিন টঙ্গীর রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন।তার সঙ্গে রয়েছেন শ্রমিকদল নেতা সালাউদ্দিন সরকার, সরকার জাবেদ আহমদ সুমন, গাজী সালাউদ্দিন, প্রভাসক বসির উদ্দিন, আরিফ হাওলাদার, রাকিব উদ্দিন সরকার, ও জসিম উদ্দিন। এখানে অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হাসান উদ্দিন সরকারের বিপরীতে তরুণ নেতৃত্বদের উপস্থিতি লড়াইকে করেছে প্রাণবন্ত। তবে শ্রমিক নেতা সালাউদ্দিবের নাম আলোচনার শীর্ষে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজীপুরের প্রতিটি আসনেই বিএনপি শক্তিশালী সাংগঠনিক ঘাঁটি তৈরি করতে পেরেছে। কিন্তু অতিরিক্ত মনোনয়ন প্রত্যাশা তাদের জন্য ‘দ্বিমুখী তলোয়ার’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।একদিকে এটি দলের তৃণমূলের সক্রিয়তা প্রমাণ করে, অন্যদিকে বিভক্তির ঝুঁকিও তৈরি করছে।অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই একক প্রার্থী ঘোষণা করে প্রচারে নেমেছে,যা বিএনপির জন্য চাপ তৈরি করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, গাজীপুরের ৬টি আসনই বিএনপির জন্য পরীক্ষার মাঠ।যদি তারা অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখতে পারে, তাহলে গাজীপুরে ধানের শীষ আবারও মাথা তুলে দাঁড়াবে।
কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত এখনো ঘোষণা হয়নি। কিন্তু গাজীপুরের প্রতিটি চায়ের দোকান, রাজনৈতিক আড্ডা, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার কেন্দ্র একটাই, কে পাচ্ছেন গাজীপুরে বিএনপির টিকিট? তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া ও বিএনপির নীতি নির্ধারকরা ইতোমধ্যে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী সবাইকে একটি বার্তা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন– মনোনয়ন একজনই পাবে, তার হয়ে সাংগঠনিকভাবে ভোটের মাঠে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার বিকল্প নাই।