
উলিপুর (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় আমন সংগ্রহ/২০২৫–২০২৬ মৌসুমে সরকারি সিদ্ধ চাল সংগ্রহে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরিত্যক্ত ও দীর্ঘদিন ধরে অচল চালকলের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিম্নমানের চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন চালকল মালিক ও স্থানীয়রা।
খাদ্য বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উলিপুর উপজেলার ৪৮টি লাইসেন্সধারী চালকলে মোট ৫৮৫.৯৯০ মেট্রিক টন সিদ্ধ চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ৫৭৪.৬২০ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল সরকারি গুদামে সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব চালকলের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ কিংবা কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।
সরেজমিনে মেসার্স উৎপল চালকল, মেসার্স সাজেদুর চালকল, মেসার্স পান্ডে চালকলসহ প্রায় ৪০টি চালকল ঘুরে দেখা যায়, এসব মিলের চাতাল, হাউস ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো চালকল কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে না। বরং অনেক জায়গায় চাতালের হাউসসহ পুরো এলাকা অন্যান্য বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও চালকলের চাতালের জায়গায় ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকটি মিল ছাড়া বাকি সবগুলোই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে মিল না চললেও কাগজে-কলমে এসব মিল সচল দেখিয়ে বরাদ্দ প্রদান করা হচ্ছে। পরে বাইরে থেকে চাল সংগ্রহ করে তা সরকারি গুদামে সরবরাহ করা হয়। এতে সরকারি নীতিমালার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে এবং নিম্নমানের চাল গুদামে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চালকল মালিক জানান, তাকে এত কম পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল যে মিল চালানো সম্ভব হয়নি। লোকসানের আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে তিনি তার বরাদ্দ বিক্রি করে দেন। তার অভিযোগ, বরাদ্দ নির্ধারণের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা উপেক্ষা করা হয়। জেলা পর্যায়ে বসেই টিসিএফ ও প্রভাবশালী মহল এসব বরাদ্দ ভাগ করে দেয়। ফলে প্রকৃত সক্ষম ও সচল মিলগুলো বঞ্চিত হয়।
অন্যদিকে এক প্রাক্তন চালকল মালিক, যিনি অনেক আগেই সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন, নিম্নমানের চাল গ্রহণ প্রসঙ্গে অভিযোগ করে বলেন, গুদামে টাকা থাকলে সবই নেওয়া হয়। ভালো-মন্দ কোনো যাচাই-বাছাই করা হয় না। চাল সদৃশ কিছু হলেই গ্রহণ করা হয় ভালো হোক বা নিম্নমানের।
নীতিমালা অনুযায়ী চালকলের পাক্ষিক ছাঁটাই ক্ষমতা ও বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতে বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও উলিপুরে তা কার্যকর হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে পরিত্যক্ত মিলের নামে বরাদ্দ দেখিয়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মিসবাহুল হোসাইনের কাছে ৪৮টি তালিকাভুক্ত চাতাল মিলের বরাদ্দ সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে তিনি জানান, তালিকাভুক্ত সচল চাতাল মিল মালিকদের অনুকূলে মোট ৫৮৬.৯৯০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ কাজী হামিদুল হক বলেন, “আপনি বললে তো হবে না, বিষয়টা আমি খতিয়ে দেখব।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান জানান, “পরবর্তীতে যেন এমন না হয় সে বিষয়ে খাদ্য নিয়ন্ত্রককে বলে দেওয়া হয়েছে এবং খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”