
স্টাফ রিপোর্টারঃ
খান শাকিল
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার আজগানা, গোড়াই, তরফপুর, লতিফপুর ও বাঁশতৈল ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় বেশ কয়েকটি লাল মাটির টিলা রয়েছে। এর অধিকাংশ টিলায় রয়েছে গজারি বাগান। আর সেসব টিলায় থাবা পড়েছে প্রভাবশালী কয়েকটি চক্রের। চক্রটির দেওয়া অর্থের লোভ সামলাতে না পেরে কেটে ফেলা হচ্ছে গজারিগাছ।
বনের ওই গাছ ইটভাটায় নেওয়ার পাশাপাশি গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে। চক্রটি রাতের আঁধারে ভেকু মেশিন দিয়ে টিলার লাল মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করছে। কেউ করছে গভীর আবার কেউ করছে সমতল। রাতে গ্রামীণ এবং আঞ্চলিক সড়কগুলোতে চলে মাটিভর্তি ড্রাম ট্রাকের রাজত্ব।
এতে এ উপজেলার পাকা রাস্তাগুলো ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে হচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মাঝে চাপা ক্ষোভ থাকলেও চক্রগুলোর ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছে না।
দৈনিক গণতদন্তকে স্থানীয়রা জানায় যে, নির্বিচারে বাগানের গজারিগাছ এবং পাহাড়ের লাল মাটি কেটে নেওয়ায় পাহাড়ি এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। অথচ গজারিগাছ এবং টিলা কাটা বন্ধে বন বিভাগ ও প্রশাসনের কোনো অভিযান নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, বনাঞ্চল ঘেরা পাহাড়ে নিঝুম রাতে মাটি কাটার ধুম পড়ে। কয়েক বছরে এই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি টিলা কেটে গভীর এবং সমতল করা হয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দিনের বেলায় মাটি কাটার স্পটে যাওয়ার প্রবেশপথে গজারিগাছ দিয়ে বেড়া দিয়ে এবং গাছের খণ্ড ফেলে রাখা হয়। রাতে কাটা হয় টিলার লাল মাটি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় যে, উপজেলার আজগানা ইউনিয়নের ঝোপবাড়ি পূর্বপাড়া এলাকায় আমিনুর রহমান, তেলিনা এলাকার (২ নম্বর ওয়ার্ডে সাবেক ইউপি সদস্য) আশরাফ আকন্দ, আতোয়ার, মনির, আওয়াল সিকদার, তরফপুর ইউনিয়নের নয়াপাড়া এলাকায় সুজন, শহিদুল, রাখের চালা নয়াপাড়া এলাকায় জুলহাস মিয়া, বস্তিবাজার এলাকায় গোড়াই সৈয়দপুর এলাকার মোশারফ হোসেন, শিরঘাটা এলাকায় মোনছের টিলার লাল মাটি কাটছেন। গাজেশ্বরী ও পাথরঘাটা এলাকা থেকেও টিলার লাল মাটি কাটা হচ্ছে।
এ ছাড়া বাঁশতৈল ইউনিয়নের গায়রাবেতিল হনু মার্কেট ও সেবার মাঠ এলাকায় রোকন মিয়া, গায়রাবেতিল উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে বাঁশতৈল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক আবিদ সিকদার, বাঁশতৈল কলেজের পশ্চিম পাশে আওয়াল সিকদার, অভিরামপুর এলাকায় শহিদুল দেওয়ান কয়েকটি ভেকু মেশিন দিয়ে টিলার লাল মাটি কাটছেন। এসব মাটি শত শত ড্রাম ট্রাক দিয়ে রাতে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করছেন তারা।
উপজেলার আজগানা, বাঁশতৈল ও তরফপুর ইউনিয়নের গ্রামগুলো ঘুরে দেখা যায় যে, টিলা থেকে গজারিগাছ কাটা হয়েছে। আবার ওই সব টিলার মাটি কেটে নিয়ে কোথাও পুকুর, কোথাও সমতল করা হচ্ছে। পাশেই অস্তিত্ব হারানো পাহাড়ের ক্ষতচিহ্ন। কোথাও কোথাও টিলার বুক চিরে সমতল করা জায়গায় স্থানীয় বাসিন্দারা ঘর নির্মাণের কাজে ব্যস্ত। টিলায় থাকা গজারিগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছও কেটে নেওয়া হয়েছে। পাহাড়ের ওপরে বসবাসের জন্য নির্মিত কয়েকটি ঘর ও পল্লী বিদ্যুতের খুঁটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। মাটিভর্তি শত শত ট্রাক চলাচল করায় ধুলায় রাস্তার পাশের গাছপালা ও ঘরের চালা ঢেকে গেছে। ভারী ড্রাম ট্রাক চলাচল করায় আঞ্চলিক এবং গ্রামের পাকা রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এতে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দারা দৈনিক গণতদন্ত কে বলেন , নির্বিচারে ও অপরিকল্পিতভাবে টিলা কাটা হচ্ছে। শুধু টিলা নয়, টিলার গজারিগাছও কাটা হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের খুঁটিও হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। টিলার তলে কিংবা পাহাড়ে যেসব বাড়িঘর রয়েছে, ভারি বর্ষণে তা ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মাটি ব্যবসায়ী জুলহাস মিয়া বলেন যে,টিলার গজারিগাছ জমির মালিক কেটেছে। আমি শুধু মাটি কিনে নিয়েছি।
তরফপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজ রেজা জানান যে, গজারিগাছ ও টিলা কাটায় শুধু পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। ঘরবাড়িও হুমকির মুখে পড়ছে। এ ছাড়া ড্রাম ট্রাকে মাটি বহন করায় রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
বাঁশতৈল ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হুমায়ুন কবীর এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন যে, পাহাড়ি এলাকার টিলার লাল মাটি কাটার বিষয়টি আমাদের জানা নেই । সন্দেহজনক পরিবহনের খবর পেলে আমরা তল্লাশি চালাই।’
পরিবেশ অধিদপ্তর টাঙ্গাইলের উপপরিচালক জমির উদ্দিনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।
বাঁশতৈল রেঞ্জের রেঞ্জার মো. শাহিনুর রহমান বলেন যে, ব্যক্তিমালিকানা জমির গজারিগাছ কাটলে আমাদের কিছু করার নেই। তবে গাছগুলো পরিবহন করা হলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারি। টিলার মাটি কাটার বিষয়টি দেখতে সংশ্লিষ্ট অফিস রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন যে, টিলার লাল মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ। রাতের আঁধারে কেউ টিলার লাল মাটি কেটে থাকলে খোঁজ নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।