
নার্গিস রুবি।। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জোন ৩/১ এর আওতাধীন ইস্টার্ন হাউজিং এর ২য় পর্বে অবস্থিত একটি ভবনের মালিক রাজউকের উচ্ছেদ অভিযানের পরেও আইন অমান্য করে নিয়ম বহির্ভূত অংশ না ভেঙে উল্টো ৮ম তলার ছাদ ঢালাইয়ের শেষ করে সেখানে অকুপেন্সী সার্টিফিকেট ছাড়াই বসবাস শুরু করেছে। অনুমোদনের স্মারকসহ প্রকাশ্যে ভবন মালিক, ডেভেলপার, স্থপতি-প্রকৌশলী, ডেভেলপার কোম্পানি ও ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার আবশ্যকতা থাকলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না রাজউক বলে অভিযোগ উঠেছে । সম্প্রতি অবশ্য এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।
ঘটনা তদন্তে রাজউক সূত্রে প্রাপ্ত নির্মাণ অনুমোদন সংক্রান্ত তথ্য থেকে জানা গেছে, রাজউক নির্মাণ অনুমোদনের স্মারক নং- ২৫.৩৯.০০০.০৯৮.৩৩.১৮৬৬.২২ অনুযায়ী ভবনের মালিক মোহাম্মদ সহিউদ্দিন মাসুম, ১৩৪/ডি, বড়বাড়ি রোড, পশ্চিম কাফরুল, ঢাকা-১২০৭। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান টু’ডে বিল্ডার্স লিঃ, রেহান মনোয়ারা ভবন, ২২০/ডি/০৪, পশ্চিম কাফরুল, বেগম রোকেয়া স্মরণী, ঢাকা-১২০৭। প্রকল্পের স্থপতি ওয়াইস কামাল শিবলী, এম আই এ বি-এস ১৭৫ এবং প্রকৌশলী মোঃ মেহেদী হাসান মারুফ, এম আই ই বি-৩২৪৪৩, ডি এম আই এন বি/সি ই-০৪৩৯। জমির অবস্থান তালতলা, আগারগাঁও; সি.এস দাগ ও এস.এ দাগ নং-১৩৬, আর.এস দাগ নং-২৫৫৩, প্লট নং-১৩৪/৫, মৌজা-কাফরুল, এলাকা-পশ্চিম কাফরুল। রাজউকের দেওয়া অনুমোদন অনুযায়ী নির্মিতব্য ভবনটি ছিল ৮ তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন এবং জমির পরিমাণ ৫.৪০ শতাংশ। অর্থাৎ অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী ৮ তলার বেশি নির্মাণ করা কোনোভাবেই বৈধ নয়, যা ভবন মালিক প্রকাশ্যেই লঙ্ঘন করছেন।
গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রাজউক জোনাল অফিস ৩/১ এর একটি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। উক্ত অভিযানে নির্মিত ভবনটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। উচ্ছেদ অভিযানের সময় ভবনটির ৩ তলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলমান ছিল। সে সময় ভবন মালিককে ১ মাসের মধ্যে ভবনের নিয়মবহির্ভূত ব্যত্যয়কৃত অংশ ভেঙে ফেলে রাজউককে জানানোর জন্য অঙ্গীকার নেওয়া হয়।
কিন্তু ভবন মালিক ওই অঙ্গীকার রক্ষা করেননি। তিনি নিয়মবহির্ভূত ব্যত্যয়কৃত অংশ ভাঙ্গার পরিবর্তে উল্টো ৮ তলা ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ করে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট গ্রহণ না করেই সেখানে বসবাস শুরু করেছেন। এতে ভবনটির নির্মাণ কাজ আরও বেআইনিভাবে এগিয়ে চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে রাজউক জোনাল অফিস ৩/১ এর ইমারত পরিদর্শক আলমগীর এবং অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ জানিয়েছেন, ভবন মালিকের এমন আচরণ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা আরও জানান, এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে কবে নাগাদ ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা এখনও নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।
আইনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভবন মালিকের এমন কার্যকলাপ বেশ কয়েকটি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ১৯৮৭ এর ১২ ধারায় অনুমোদন ছাড়া কোনো ইমারত নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ বা সম্প্রসারণ করা নিষেধ করা হয়েছে। একই আইনের ২৬ ধারায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের বিধান রয়েছে। অপরদিকে ভবন নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ৩ ধারায় অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ কাজ করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এছাড়া ভবন নির্মাণ বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী কোনো ভবনে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া বসবাস করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ভবন মালিক উচ্ছেদ অভিযানের পর রাজউকের দেওয়া শর্ত অমান্য করে ভবনের কাজ এগিয়ে নেওয়ায় তার বিরুদ্ধে উক্ত আইনের আওতায় কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
এ ঘটনায় ভবন মালিক এবং সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ১৯৮৭ এর ২৭ ধারা অনুযায়ী মামলা রুজু করা যেতে পারে। উক্ত ধারায় অনুমোদন ছাড়া বা শর্ত লঙ্ঘন করে নির্মাণ কাজ করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। একই আইনের ২৮ ধারায় কোনো অপরাধ যদি কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান করে থাকে তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যক্ষ দায়িত্বে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হবে যদি না প্রমাণ করা যায় যে অপরাধটি তার অজ্ঞাতসারে ঘটেছে বা তিনি যথাসাধ্য প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন। ফলে ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক বা প্রকল্প প্রধানসহ সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এছাড়া ভবন নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ৫ ধারায় অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘন করে নির্মাণ কাজ করার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। ভবন মালিক প্রতিদিন যেহেতু অবৈধ স্থাপনাটি দখলে রেখেছেন এবং ব্যবহার করছেন তাই এটি একটি চলমান অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। পাশাপাশি নির্মাণ কাজের মাধ্যমে জনসাধারণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে দণ্ডবিধির ৩৩৬, ৩৩৭ এবং ৩৩৮ ধারায় শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
অন্যদিকে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হন বা ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করেন তবে তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। দণ্ডবিধির ২১৭ ধারায় কোনো সরকারি কর্মচারী যদি আইনের নির্দেশ অমান্য করে কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কাজ করেন তবে তিনি শাস্তিযোগ্য অপরাধে দণ্ডনীয় হবেন। একইভাবে দণ্ডবিধির ১৬৬ ধারায় সরকারি কর্মচারী যদি আইন অমান্য করে কোনো ব্যক্তির ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে বা ক্ষতি করতে ব্যর্থ হন তবে তিনি দণ্ডনীয় হবেন। দণ্ডবিধির ১৬৭ ধারায় ভুল তথ্য সংবলিত নথি প্রস্তুত করলে এবং ২১৮ ধারায় ভুল রেকর্ড প্রস্তুত করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ এর ৫ ধারায় সরকারি কর্মচারী যদি তার পদের অপব্যবহার করে কোনো ব্যক্তিকে অবৈধ সুবিধা দেন বা আইন প্রয়োগে ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যর্থ হন তবে তিনি দুর্নীতির দায়ে দণ্ডিত হতে পারেন। যদি রাজউক কর্মকর