
লুৎফর রহমান হীরা, চাটমোহর, পাবনাঃ
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো ইউনিয়ন পরিষদ। গ্রামীণ জনগণের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ভূমি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং গ্রাম আদালতের কার্যক্রম—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সদস্যরা।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। রিটে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদের জন্য ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা উচিত। হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি শেষে সরকারকে রুলের মাধ্যমে জানতে চেয়েছেন, কেন চেয়ারম্যান পদে ন্যূনতম স্নাতক শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে না।
রিটকারীদের অন্যতম যুক্তি হলো, গ্রাম আদালত আইন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপের এখতিয়ার রয়েছে। অন্যদিকে একই ধরনের আর্থিক ক্ষমতা প্রয়োগকারী দ্বিতীয় শ্রেণির জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হতে হলে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয় এবং আইন বিষয়ে স্নাতকসহ নির্ধারিত যোগ্যতা থাকতে হয়। সেই তুলনায় কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই একজন ব্যক্তি ইউপি চেয়ারম্যান হতে পারা আইনগত সামঞ্জস্যের প্রশ্ন তুলেছে।
কেন শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের দাবি উঠছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে একজন ইউপি চেয়ারম্যানকে শুধু উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, সরকারি নীতিমালা বোঝা, বাজেট প্রণয়ন, ডিজিটাল সেবা পরিচালনা, আইন প্রয়োগ, গ্রাম আদালতের বিচার এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। এসব কাজ দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে ন্যূনতম উচ্চশিক্ষা সহায়ক হতে পারে।
স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনও পূর্বে সুপারিশ করেছিল যে, চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে প্রার্থীদের জন্য অন্তত স্নাতক ডিগ্রি থাকা উচিত।
বিপরীত মতামত
অন্যদিকে অনেকের মত হলো, গণতন্ত্রে জনগণই শেষ কথা। কোনো ব্যক্তি উচ্চশিক্ষিত না হলেও তিনি সততা, অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব এবং জনগণের আস্থার ভিত্তিতে একজন সফল জনপ্রতিনিধি হতে পারেন। অতিরিক্ত শিক্ষাগত শর্ত আরোপ করলে অনেক জনপ্রিয় ও অভিজ্ঞ স্থানীয় নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারাতে পারেন।
সচেতন নাগরিক হিসেবে মতামত
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক করতে জনপ্রতিনিধিদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশেষ করে যেহেতু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উন্নয়ন প্রশাসনের পাশাপাশি গ্রাম আদালতের বিচারিক দায়িত্বও পালন করেন, তাই আইন, প্রশাসন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা জনস্বার্থে ইতিবাচক হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, আইন ও প্রশাসন বিষয়ক দক্ষতা উন্নয়ন এবং নিয়মিত মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা আরও কার্যকর হতে পারে।
হাইকোর্টের রুলের মাধ্যমে বিষয়টি এখন বিচারাধীন। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রয়োজনে সংসদের আইন সংশোধনের ওপর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারকে আরও দক্ষ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক করার লক্ষ্যে জনপ্রতিনিধিদের যোগ্যতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।