
চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা:
পাবনার জেলার চাটমোহরে বসেছিল ব্যতিক্রমী এক পুথিপাঠের আসর। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো মুসলিম সমাজে বিকশিত বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারা—পুথিসাহিত্য—কালের বিবর্তনে আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। সেই বিলুপ্তপ্রায় সাহিত্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাটমোহরের একদল সাহিত্যপ্রেমী তরুণ আয়োজন করেন এই আসর।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের প্রত্যন্ত সোনাহারপাড়া গ্রামের কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠানে শুরু হয় পুথিপাঠ। চাঁদের আলো, কুপিবাতি ও হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় তৈরি হয় গ্রামীণ আবহ। উঠানে মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে বসেছিলেন নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী দর্শক-শ্রোতা। গায়েনের সুরেলা কণ্ঠে পুথির কাহিনি ও পদ্য পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে মুগ্ধকর।
চাটমোহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ আসাদুজ্জামান দুলাল ছিলেন অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। তিনি পাঠ করেন ঐতিহ্যবাহী পুথি ‘বিবি সোনাভান’। পাশাপাশি স্থানীয় গ্রামীণ গায়েন মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক পরিবেশন করেন ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’।
আয়োজনটি ছিল সম্পূর্ণ অনাড়ম্বর। কোনো বিশেষ অতিথি বা অতিথি তালিকা ছিল না। হাতে লেখা পোস্টার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে পুথিপাঠের খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে চলনবিলের সময় সহ কয়েকটি জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদপত্রেও এ আয়োজনের খবর প্রকাশিত হয়। এতে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়ে। রাতে পুরো উঠান নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে যায়। ঢাকা থেকে চলচ্চিত্রের সাউন্ড প্রকৌশলী রিপন নাথও অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ ছাড়া চাটমোহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মী ও স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছিল।
পুথিপাঠের আয়োজন সফল করতে সার্বিক সহযোগিতা করেন সজল বিশ্বাস, ডা. আতিক, বিপ্লব আচার্য্য, নিয়ামুল মুক্তা, প্রভাষক আব্দুল মান্নান, অম্লান ভট্টাচার্য, সৌরভ কুণ্ডু, শুভ কর্মকারসহ সোনাহারপাড়া গ্রামের অনেক বাসিন্দা। অনুষ্ঠানের আয়োজকদের পক্ষ থেকে আসাদুজ্জামান দুলাল, লইমুদ্দিন প্রামাণিক ও ওসমাণ গণিকে সম্মাননা দেওয়া হয়। রাত ১১টা পর্যন্ত চলা এ আয়োজনে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে পুথির পরিবেশনা উপভোগ করেন।
আয়োজকদের অন্যতম সহযোগী ডা. আতিক বলেন, পুথিপাঠের আসরে একসময় ‘আমীর হামজা’, ‘শাহনামা’, ‘আলেফ লায়লা’, ‘হাতেমতাই’, ‘কমলা সুন্দরী’, ‘দেলদার কুমার ও শাহজাদী দিল পিঞ্জির কিচ্ছা’, ‘জঙ্গনামা’, ‘আমীর সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরী’, ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’, ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’, ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘বিবি সোনাভান’, ‘ফকির বিলাস’ ও ‘লাইলী-মজনু’সহ বিভিন্ন পুথি পাঠ করা হতো। হানিফা, হামজা, হাতেমতাই, সোহরাব-রুস্তম ও জৈগুন বিবির মতো বীর ও কাহিনিনির্ভর চরিত্র নিয়ে রচিত পুথিগুলোও মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল।
তিনি আরও বলেন, কালের পরিবর্তন, আধুনিক বিনোদন সংস্কৃতির বিস্তার এবং সময়ের সঙ্গে মানুষের রুচির পরিবর্তনের কারণে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুথিপাঠের আসর এখন বিলুপ্তির পথে। উপমহাদেশে পুথিসাহিত্যের বিকাশ শুরু হয় প্রায় আঠারো শতকে। আনুমানিক ১৬৮০ থেকে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে হুগলির বালিয়া-হাফেজপুরের কবি ফকির গরীবুল্লাহ ‘আমীর হামজা’ রচনার মাধ্যমে এই কাব্যধারার সূত্রপাত করেন বলে ধারণা করা হয়।
ডা. আতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পুথির প্রায় ৩২ শতাংশ শব্দ ছিল বিদেশি উৎস থেকে আসা। মধ্যযুগে প্রায় ৫০০ বছর ধরে প্রচলিত বাংলা সাহিত্যের ভাষারীতি থেকে পুথিসাহিত্যের ভাষা ছিল স্বতন্ত্র। ধারণা করা হয়, পুথিসাহিত্যের ভাষার উৎস ছিল কলকাতা, হাওড়া, হুগলি ও চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের মানুষের কথ্যভাষা।
তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পুথিসাহিত্যের আগের সেই চাহিদা আর নেই। তারপরও কিছু মানুষ এই ঐতিহ্যের চর্চা ধরে রেখেছেন। হারিয়ে যেতে বসা এই সাংস্কৃতিক ধারাকে আবারও মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে আনতেই পুথিপাঠের আসরের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত জেমান আসাদ বলেন, পুথিপাঠ শুরুর আগে চারপাশের বৈদ্যুতিক আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। মশাল, হ্যারিকেন ও কুপিবাতির আলোয় আসাদুজ্জামান দুলালের কণ্ঠে যখন পুথিপাঠ শুরু হয়, তখন মাথার ওপর ছিল পূর্ণিমার চাঁদ। পুরো আয়োজনেই পুরোনো গ্রামীণ পুথিপাঠের আবহ ফিরিয়ে আনার আন্তরিক চেষ্টা ছিল।
তিনি বলেন, আয়োজনটি ছিল চমৎকার। আয়োজকেরা পরিবেশ তৈরির জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে যে আগ্রহ দেখিয়েছেন, তা প্রমাণ করে লোকজ ঐতিহ্যের কাছে মানুষের ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এখনো রয়েছে।
উপস্থিত দর্শকদের অনেকেই বলেন, পুথিপাঠকে ঘিরে মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া আশাব্যঞ্জক। নতুন করে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তা ধরে রাখতে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করার বিষয়টি আয়োজকদের বিবেচনা করা উচিত। এতে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে আবারও পরিচিত হয়ে উঠতে পারে।