
এম এইচ মুন্না:
বাতিল হওয়া সরকারি প্লট ২৮ বছর পর মিরাকেল বানিয়ে পুনরুজ্জীবিত করা, ব্যাংকের ভুতুড়ে চালানকে খাঁটি বানিয়ে দায়মুক্তির সনদ দেওয়া, কর্মচারীকে দিয়ে টেবিলে টেবিলে ঘুষের টাকা গোনা এবং নিয়োগহীন পাইক-পেয়াদা দিয়ে পুরো সরকারি অফিস চালানো জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের (জাগৃক) চট্টগ্রাম কার্যালয়ে যেন চলছে এক রূপকথার হরিলুট! আর এই পুরো নাটকের মূল কারিগর দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (এস্টেট) মো. নাসির উদ্দিন।
জানা যায়, ২০১১ সালে চাকরিতে যোগ দিয়ে ২০১৩ সালে চট্টগ্রামে বদলি হয়ে আসা এই কর্মকর্তা অল্প সময়ের জন্য অন্যত্র দায়িত্ব পালন করলেও দীর্ঘ সময় ধরে চট্টগ্রামেই শিকড় গেড়েছেন। দুদকের খাতা-কলমে তিনি ফেরারি বা পলাতক আসামি হলেও, বাস্তবে নিজ প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রভাবে চট্টগ্রাম জাগৃক দপ্তরের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে নিজ দায়িত্বের পাশাপাশি নোয়াখালী মাইজদী, শেরশাহ, হালিশহর, ফিরোজশাহ ও কক্সবাজার ফ্ল্যাট প্রকল্প এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কৈবল্যধাম হাউজিং এস্টেটের ম্যানেজারসহ মোট ৬টি পদের দায়িত্ব একহাতে সামলে বহাল তবিয়তে রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন।
হালিশহর হাউজিং এস্টেটের ‘এ’ ব্লকের ২ নম্বর রোডের ২ নম্বর লেনের ৬ নম্বর বাণিজ্যিক প্লটটি (যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা) ১৯৯০ সালের নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে মোহাম্মদ আলমের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রথম কিস্তির ৯৩,৬২৬ টাকা পরিশোধ না করায় ১৯৯১ সালের ২০ ডিসেম্বর বরাদ্দ বাতিল ও জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়। ২০০৭ সালের তালিকায়ও এটি অনাবিষ্কৃত ও অবৈধ দখলে থাকা প্লট হিসেবে ছিল এবং ২০১০ সালে এটি পুন-বরাদ্দের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়। ২০০৯ সালে আবেদনকারী আবার তদ্বির শুরু করলে ২০১৮ সালে নাসির উদ্দিন অলৌকিকভাবে ফাইলটি পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব নেন। ১৯৯০ সালের যে চালানের ওপর ভর করে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পত্তি মাত্র ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৭ টাকায় দায়মুক্তি ও দখল হস্তান্তরের ছাড়পত্র দেওয়া হলো, ২০২০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের যাচাইয়ে দেখা গেল, সেই চালানের কোনো অস্তিত্বই নেই, এমনকি চালানে উল্লিখিত ১৬ নম্বরের জমা দেওয়ার দিনটি ছিল সরকারি ছুটির দিন ‘শুক্রবার’! পানির দরে সরকারি সম্পত্তি তুলে দিয়ে জালিয়াতির রাজপ্রাসাদ গড়ার অপরাধে ২০২২ সালে দুদক মামলা করলেও নাসির কিংবা তাঁর সঙ্গীরা আজ পর্যন্ত আদালতে হাজির হয়ে জামিন নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।
তার প্রশাসনিক দাপটীয় লুটপাট কেবল কাগজেই আটকে নেই, হাটে-বাজারেও ছড়িয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, জাগৃক চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কক্ষেই বসে জয়নাল নামের এক পরিচিত দালালের কাছ থেকে পরম আনন্দে টাকা গুনে নিচ্ছেন অফিস সহকারী হেলাল উদ্দিন। অনুসন্ধানে প্রকাশ, নামজারির এই ঘুষের টাকা মূলত প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাসিরের হয়েই গ্রহণ করা হচ্ছিল। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সরকারি কোনো নিয়োগপত্র বা রাজস্ব খাতের বেতন ছাড়াই অফিসে সান্টু, উজ্জ্বল ও পিল্টন এবং কৈবল্যধাম অফিসে অনিক, সাজ্জাদ, আবু ও মিনহাজ নামের বহিরাগত ব্যক্তিদের বসিয়ে দাপ্তরিক নথি নাড়াচাড়া করানো হচ্ছে, যাদের ব্যক্তিগত বেতন-ভাতাও নাকি নাসির নিজেই বহন করেন!
নগরের আকবর শাহ থানার বিশ্বকলোনি এলাকায় জাগৃকের জায়গায় অনুমোদনহীন ‘সেভেন মার্কেট’-এর শতাধিক কাঁচা-পাকা দোকান থেকে মাসে অন্তত ৩ লাখ টাকা এবং দপ্তরের ফটকের পাশের দোকান থেকেও অবৈধ ভাড়া তোলা হয়। এছাড়া অদূরে থাকা একটি পরিত্যক্ত ভবনে আদেশ সত্ত্বেও ভবন না ভেঙে অন্তত ৩০টি পরিবারকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে রেখে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের কলাতলী মোড়ে জাগৃকের ভবনে ৪৬৯টি ফ্ল্যাটের মধ্যে নিজের আপন বোন নীলা রহমানের নামে নীলা রহমানের সুবিধাজনক কোটায় ৭৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট (এফ/৫) বাগিয়ে নেওয়া এবং নিজে ফ্ল্যাট বরাদ্দ কমিটির সদস্য হয়েও নিজের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নেওয়া, শ্বশুরবাড়ি দিনাজপুর ও রাঙামাটির নানিয়ারচরে আলিশান বাড়ি নির্মাণের তথ্যও সামনে এসেছে। এমনকি চট্টগ্রাম নগরের পূর্ব ফিরোজশাহ আবাসিক এলাকায় সিডিএ অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে নির্মিত ভবনের বড় বড় ফ্ল্যাটেরও এস্টেট শাখা থেকে অনৈতিক আশ্বাস দিয়ে নামজারি করিয়ে দেওয়ার ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে।
আমলাতান্ত্রিক এই জাঁতাকলে পড়ে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের নাভিশ্বাস উঠছে। পুলিশ পরিদর্শক ফজলুর রহমানের স্ত্রীকে প্লটের ছোট সমস্যার জন্য ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ৪ বছর ঘুরতে হয়েছে, যা শেষমেশ চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপে সুরাহা হয়। অন্যদিকে মীর মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম নামের এক ব্যক্তি প্লট রেজিস্ট্রি করার সামান্য কাজের জন্য ১০ মাস ধরে ফাইল ঝুলিয়ে রেখে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। নাসিরের মনোনীত নির্দিষ্ট দালাল চক্র না ধরলে কোনো নথিই এক ইঞ্চি নড়ে না বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
অভিযোগের পাহাড় সামনে আসার পর যথারীতি অস্বীকারের পুরানো সুর গেয়েছেন মো. নাসির উদ্দিন। জনবল সংকটের দোহাই দিয়ে বহিরাগতদের রাখা, বোন ও নিজের নামে ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়মমাফিক দাবি করা কিংবা দোকান ও পরিত্যক্ত ভবনের ভাড়ার সাথে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও দাপ্তরিক নথি ও অকাট্য প্রমাণের বৈপরীত্য তাঁর প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট করে দিয়েছে।