
মোঃ রেজাউল করিম (ব্যুরো চীফ কুমিল্লা)
এক বিস্মৃত যোদ্ধার গল্প
যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য, কিন্তু জীবদ্দশায় পাননি প্রাপ্য সম্মান — সন্তানের আকুল আবেদন: “আমার বাবার আত্মার মাগফিরাত ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চাই
একজন মানুষ—যিনি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক, সমাজসেবক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকসুলভ নেতা, এবং একই সঙ্গে একজন সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
অথচ জীবদ্দশায় তিনি পাননি তাঁর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান।
তিনি হলেন মরহুম মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া।
আজ তাঁর সন্তানদের পক্ষ থেকে একটাই আকুল আবেদন—
“সবার কাছে বাবার জন্য দোয়া চাই। আল্লাহ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন। আর রাষ্ট্র যেন তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অবদান যথাযথভাবে যাচাই করে সম্মান প্রদান করে।”
মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির সাহসী যোদ্ধা
মরহুম মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। সে সময় তিনি বরিশালের গৌরনদী থানায় কর্মরত ছিলেন।
তাঁর ছেলে, সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম তরুন বলেন,
“আমার বাবা ছিলেন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি—দুটো থেকেই বঞ্চিত হয়েছেন। কোনো সরকারই তাঁর এই ন্যায্য স্বীকৃতি নিশ্চিত করেনি। আমরা চাই, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হোক এবং প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হোক। যারা মৃত্যুবরণ করেছেন কিন্তু স্বীকৃতি পাননি, তাঁদের সন্তানদেরও মূল্যায়ন সনদ দেওয়া হোক।”
পরিবার সূত্রে জানা যায়, এক পর্যায়ে খবর আসে যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গৌরনদী থানা দখল করতে যাচ্ছে। তখন এসপির নির্দেশে, তাঁর নেতৃত্বে থানার অস্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মালামাল পার্শ্ববর্তী একটি কলেজে স্থানান্তর করা হয়।
শুধু তাই নয়, তিনি ওই কলেজ মাঠে রাতে স্থানীয় তরুণ ও যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন টিম গঠন করেন এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ দেন। ফলে তিনি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন।
তাঁর সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন—
হাবুল মাঝি, কাবিল মাঝি, হাসেমসহ আরও অনেকে।
বাটা জোড়া ব্রিজ এলাকায় পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ
পরিবারের ভাষ্যমতে, তিনি বরিশালের গৌরনদী থানাধীন বাটা জোড়া ব্রিজ সংলগ্ন পশ্চিমাংশে পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
এই যুদ্ধ ছিল জীবনবাজি রেখে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
পরিবারের দাবি, যুদ্ধের সেই স্মৃতি, সহযোদ্ধাদের সাক্ষ্য এবং তাঁর তৎকালীন ভূমিকা—সবকিছুই আজও অনেকের মুখে মুখে জীবন্ত রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নথিতে তাঁর নাম না থাকায়, সেই ইতিহাস এখনো পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি।
যুদ্ধ শেষে সনদ পেলেও হয়নি গেজেটভুক্তি
মুক্তিযুদ্ধ শেষে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নীপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় তালিকা অনুযায়ী জেনারেল ওসমানীর স্বাক্ষরিত সনদ তাঁদের মধ্যে প্রদান করা হয়।
কিন্তু এখানেই শুরু হয় এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।
পরবর্তীতে সেই সনদ গেজেটভুক্ত করার জন্য বরিশাল থেকে টেলিগ্রাম এলেও, তিনি অসুস্থ থাকায় আর সেখানে যেতে পারেননি। ফলে তাঁর মুক্তিযুদ্ধের সনদটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
পরে যখন সরকারিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, ভাতা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা চালু হয়, তখন গেজেটবিহীন সনদ দিয়ে তিনি আর কোনো সুবিধা গ্রহণ করতে পারেননি।
অর্থাৎ, যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে গেছেন বঞ্চিত।
২০১১ সালের যাচাই-বাছাইয়েও বিতর্কিতভাবে বাদ
পরিবারের দাবি, ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের তালিকায় তাঁর নাম ঢাকায় পাঠানো হয়।
কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি রতনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থাকায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দুর্নীতির কারণে তাঁকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী,
তৎকালীন নবীনগর উপজেলার এক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁকে “বিএনপির ট্যাগধারী” হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তাঁর জমাকৃত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উপজেলা অফিস থেকে উত্তোলন করে গায়েব করে দেন।
এর ফলে, একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ভাতা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বশীল কর্মজীবন
মরহুম মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া বাংলাদেশ পুলিশে সততা, নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ১৯৮৪ সালে পিরোজপুর থানা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
অবসরের পর তিনি তাঁর পৈত্রিক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ভিটি বিশারা নয়াপাড়ায় স্থায়ীভাবে চলে আসেন। জীবনের শেষ সময় তিনি গ্রামের বাড়ি ও কুমিল্লায় সময় কাটিয়েছেন।
তাঁর পরিচিতজনদের ভাষ্য, তিনি কর্মজীবনে যেমন ছিলেন দায়িত্বশীল, ব্যক্তিজীবনেও ছিলেন শান্ত, ন্যায়নিষ্ঠ ও জনমুখী একজন মানুষ।
রাজনীতি, সমাজসেবা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব
তিনি শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা বা সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন জনবান্ধব, দায়িত্বশীল ও সমাজমনস্ক মানুষ।
তিনি রতনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও মসজিদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানো, সামাজিক বিরোধ মীমাংসা করা, ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে সহযোগিতা করা—এসব কাজের জন্য তিনি এলাকায় ছিলেন একজন সম্মানিত ও প্রিয় ব্যক্তিত্ব।
পরিবার ও এলাকাবাসীর ভাষায়,
তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভালো মনের, সৎ, বিনয়ী ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ।
২০১৬ সালে চিরবিদায়, কিন্তু রয়ে গেছে অপূর্ণ স্বীকৃতির বেদনা
দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের পর ২০১৬ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।
পরিবার জানায়, ২০১২ সালে তাঁর বক্তব্য স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালে সেই বিষয়টি ‘দৈনিক আমাদের কুমিল্লা’-তেও পুনরায় প্রকাশিত হয়।
কিন্তু এতকি