
মো.হাইউল উদ্দিন খান,গাজীপুর প্রতিনিধি
একটি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সহকর্মী হারানোর ক্ষত শুকায়নি, থামেনি বিচার চাওয়ার কণ্ঠ। সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যার এক বছর পূর্তিতে আবারও ক্ষোভ, বেদনা আর বিচারের দাবিতে একত্র হয়েছেন সাংবাদিকরা।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় গাজীপুর সিটির চান্দনা চৌরাস্তার ‘তুহিন চত্বরে’ বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে তুহিন হত্যা মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার জোর দাবি জানানো হয়। বিচার চাইতে বাদ যায়নি তুহিনের ৬ বছরের বড় ছেলে তৌকিরও। সেও ব্যানারের সামনে এসে বসেছে।দৃশ্যটি যে কারোরই অন্তরে দাগ কাটবে।
কর্মসূচিতে প্রদর্শিত ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা ছিল, “৭ আগস্ট সাংবাদিক তুহিন হত্যার এক বছর, বিলম্ব নয় দ্রুত বিচার আইনে বিচার করতে হবে।”
ঠিক এক বছর আগে এই গাজীপুর সিটির চান্দনা চৌরাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন।
বছর ঘুরে সেই ঘটনাস্থলের কাছেই যখন সহকর্মীরা তার হত্যার বিচারের দাবিতে দাঁড়ালেন, তখন পুরো কর্মসূচিজুড়ে ফিরে আসে সেই দিনের বেদনা। কারও কণ্ঠে ক্ষোভ, কারও চোখেমুখে শোক, কিন্তু সবার দাবি ছিল একটাই, তুহিন হত্যার বিচার আর বিলম্বিত করা যাবে না।
বক্তারা বলেন, সাংবাদিক হত্যা শুধু একজন সংবাদকর্মী বা একটি পরিবারের ওপর আঘাত নয়, এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মানুষের জানার অধিকারের ওপর আঘাত। একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে হত্যা করা হবে, অথচ তার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে, এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
তারা তুহিন হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার আইনের আওতায় নিয়ে বিচারিক কার্যক্রম দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করা ও অপরাধ প্রমাণিত হলে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন, ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও আহমেদ আবু জাফর, বাংলাদেশ মফশ্বল সাংবাদিক ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. তাওহীদ হাসান, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আলাউদ্দিন, ঢাকা জেলা বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের যুগ্ম আহবায়ক মো. আবুল কাশেম তালুকদার ও কেন্দ্রীয় সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা সিকান্দার আলী বাবুল।
এ সময় সাংবাদিক নেতারা বলেন, তুহিন হত্যার এক বছর পূর্ণ হলেও তাদের আন্দোলন থামেনি। বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সাংবাদিক সমাজ রাজপথ ছাড়বে না। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের প্রতি মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তাদের ভাষায়, “আজ আমরা শুধু তুহিনের জন্য দাঁড়াইনি। আমরা দাঁড়িয়েছি দেশের প্রতিটি সাংবাদিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের অধিকারের জন্য। তুহিন হত্যার বিচার নিশ্চিত না হলে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তারও উত্তর মিলবে না।”
বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশকে বেরিয়ে আসতে হবে। তুহিন হত্যা মামলার একটি দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে পারে।
এক বছর আগের রক্তাক্ত স্মৃতি বুকে নিয়ে শুক্রবার আবারও সরব হলো চান্দনা চৌরাস্তা। যে জায়গায় তুহিনের স্মৃতি আজও সাংবাদিকদের তাড়া করে ফেরে, সেখানেই উচ্চারিত হলো দৃঢ় প্রত্যয়:
“তুহিন হত্যার বিচার চাই। বিলম্ব নয়, দ্রুত বিচার চাই।”
দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের সম্পাদক ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মো. খায়রুল আলম রফিক বলেন, “বাংলাদেশে বহু সাংবাদিক হত্যার বিচার হয়নি। কিন্তু আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যা মামলায় যেভাবে দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম এগোচ্ছে, তা সাংবাদিক সমাজের জন্য আশার বার্তা। এই মামলার বিচার সম্পন্ন হলে সাংবাদিক হত্যা মামলার বিচারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে তুহিন হত্যাকারীদের ফাঁসি দেখবার জন্য।
সাংবাদিকদের প্রত্যাশা, এই দাবি আর কেবল ব্যানার, মানববন্ধন কিংবা স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তুহিন হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে, আর সেই বিচারই হবে নিহত সহকর্মীর প্রতি সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘ অপেক্ষার সবচেয়ে বড় জবাব।