বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
খানসামায় প্রাথমিক শিক্ষা গিলে খাচ্ছে হুমায়ুন কবির পটুয়াখালীতে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়নে সিভিল সোসাইটির অ্যাকশন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত  ‎দক্ষিণখানে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ শীর্ষ ৪ সন্ত্রাসী গ্রেফতার ‎ তবকপুর ভূমি অফিসে ঘুষ লেনদেন, দরকষাকষির ভিডিও প্রকাশ্যে বিমানবন্দরের সামনে সেন্টার পয়েন্ট শপিং মলের ফুডকোর্টে আগুন মশা নিধনে ইউএসএ’র ‘বিটিআই’ ব্যবহারে গাসিকের জোরদার কার্যক্রম গজারিয়া এমপি’র বাড়ি চিনেননা বৃদ্ধ, দেখিয়ে দেয়ার কথা বলে টাকা-মোবাইল ছিনতাই করে যুবক রূপসায় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত ।  ফেব্রিক রোলের ভেতরে ১,৬৫৫ দামি মোবাইল, শাহজালালে জব্দ বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন নয়, ১৬ ডিসেম্বর চালু হতে পারে থার্ড টার্মিনাল

খানসামায় প্রাথমিক শিক্ষা গিলে খাচ্ছে হুমায়ুন কবির

  • প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

 

 

এম এইচ মুন্না: দিনাজপুরের খানসামায় এখন ‘শিক্ষা’ শব্দের মূল উপজীব্যই পাল্টে গেছে। সেখানে শিক্ষকতা মানেই দস্তখতের দাসত্ব, আর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস যেন চলতি দায়িত্বে আসীন শিক্ষা অফিসার মো: হুমায়ুন কবির তালুকদারের ব্যক্তিগত ‘খাজনাখানা’। ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার কাঁঠালডাংগির বাসিন্দা এই বিতর্কিত কর্মকর্তা দিনাজপুরের নানা উপজেলায় জালের মতো বিস্তার করেছেন তার অনিয়মের নেটওয়ার্ক। খানসামায় যোগদানের আগে দিনাজপুর সদর উপজেলা ছিল তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল। এর আগে বোচাগঞ্জ, বীরগঞ্জ, বিরল, চিরিরবন্দর ও দিনাজপুর সদর উপজেলায় কর্মরত থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতির পাহাড়সম প্রমাণের পাশাপাশি নারী শিক্ষকদের সাথে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর গুরুতর অভিযোগ ওঠে। বীরগঞ্জে কর্মরত থাকাকালীন ‘আশা হোটেল’-এর সামনে এক নারী শিক্ষিকার স্বামীর হাতে প্রকাশ্যে গণধোলাই ও মারপিট খাওয়ার পরেও ক্ষমতার অলৌকিক বলে পার পেয়ে যান এই কর্মকর্তা। অন্যান্য কর্মস্থলেও তার এমন কুকীর্তি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কলঙ্কজনক অধ্যায় আজও শিক্ষা দপ্তরের আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

 

খানসামায় আসার পর ক্ষমতার দাপটে অন্ধ এই কর্মকর্তার দুর্নীতির সাম্প্রতিকতম সংযোজন, বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনগুলোর পাঠদানের অনুমোদন বাণিজ্য। বর্তমানে চলমান অনলাইনে পাঠদানের অনুমতি সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার নামে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি হাঁকাচ্ছেন একমুঠো নগদ টাকা; প্রত্যয়ন প্রতি সুনির্দিষ্ট ৩০ হাজার টাকা না মিললে ঝুলে থাকে অনুমোদনের ভাগ্য। উপজেলার ৬০টিরও বেশি কিন্ডারগার্টেনকে প্রশাসনিক ফাঁদে আটকে ইতোমধ্যেই তিনি একচ্ছত্রভাবে পকেটে পুরেছেন ১৮ লক্ষাধিক টাকার বিশাল উৎকোচ। শিক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর গড়ার নাম করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে এভাবে অর্থ আদায় যেন খানসামার বুকে এক নির্মম রাজকরের রাজস্ব আদায়!

 

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে পীরগঞ্জের প্রতিবেশী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের একচ্ছত্র ক্ষমতার নাম ভাঙিয়ে যখন তিনি এই তল্লাটে পা রাখেন, তখন থেকেই খানসামার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার ঘাড় চেপে ধরেছে এক আতঙ্কের অজগর। খানসামা উপজেলায় চলতি দায়িত্বে যোগদানের পূর্বে তিনি চিরিরবন্দরে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার (AUEO) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পদোন্নতি আর চলতি দায়িত্বের গোলকধাঁধায় তাঁকেই এই খানসামা অফিসের শীর্ষ চালিকাশক্তি বানিয়ে দেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় প্রকাশ্য দিবালোকে প্রাতিষ্ঠানিক ডাকাতপনা। প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ- ক্ষুদ্র মেরামত, রুটিন মেইনটেন্যান্স, স্লিপসহ বিভিন্ন খাতের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেও তিনি অধরা, অনড় এবং অবিনশ্বর।

 

দপ্তরটির অলিখিত বিধান একটাই, ‘টাকা ফেলো, ফাইল নাও’। কনজ্যুমারস লোনের অনুমোদন পেতে ফাইলপ্রতি পাঁচ হাজার টাকার অলিখিত চুক্তি, পেনেশনের নথিতে জীবনের শেষ উপার্জনের ভাগ বসাতে ৩০ হাজার টাকার সোজা দাবি, আর সার্ভিসের ভুল শোধরাতে কিংবা বেতনের চাকা সচল রাখতে উৎকোচের বাঁধাধরা রেটচার্ট। শিক্ষকদের ট্রেনিংয়ের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণ কিংবা মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো পরম মানবিক ক্ষণটিকেও তিনি নামিয়েছেন সস্তা দরদামের হাটে। জিপিএফ বা লোন ফর্মে প্রীতিচিহ্ন হিসেবে মুদ্রার ঝংকার না উঠলে হুমায়ুন কবিরের কলমের কালি ফোটে না।

 

অঙ্কের খাতিরেই হোক বা অন্যায়ের, লুটপাটের নতুন নতুন ফিকির বের করায় এই কর্মকর্তার জুরি মেলা ভার। বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্যমতে, খানসামা উপজেলায় দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষায় শিক্ষার্থী প্রতি ১৭ টাকা হারে প্রশ্ন বিক্রি করে তিন লক্ষাধিক টাকার ব্যবসা ফেঁদেছেন এই শিক্ষা অফিসার। উপজেলার ১৮ হাজার শিক্ষার্থীর প্রশ্ন তৈরিতে প্রতি সেট সর্বোচ্চ তিন টাকা হিসেবে খরচ মাত্র ষাট হাজার টাকা হলেও, অনায়াসে দুই লক্ষাধিক টাকা পকেটে পুরেছেন তিনি। একইভাবে ২০২৫ সালে তিনটি সাময়িক পরীক্ষায় শিক্ষার্থী প্রতি ২০ টাকা হারে আদায় করেছিলেন। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হওয়া দুই শিক্ষককে পোহাতে হয়েছে মধ্যযুগীয় হেনস্থা। ২০২৬ সালের প্রথম ও দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষাতেও সেই একই ১৭ টাকার বাণিজ্য অব্যাহত। ২০২৫ সাল থেকে মোট পাঁচটি সাময়িক পরীক্ষায় কেবল প্রশ্ন বিক্রি করেই তিনি পকেটে পুরেছেন প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকা। তদুপরি, ২০০ টাকার মডেল টেস্টের ভুয়া ফাও তুলে সব মিলিয়ে পরীক্ষা বাণিজ্যে পকেট কেটেছেন ১৫ লক্ষাধিক টাকার।

 

শিক্ষা অফিসার হুমায়ুন কবিরের শকুনের চোখ আর অসংকোচ লোভের থাবা থেকে বাদ পড়েনি কোনো সরকারি তহবিলই। বরাদ্দকৃত সকল খাতের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ অর্থ প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রশাসনিক ভয় দেখিয়ে সরাসরি ছিনিয়ে নেওয়া তার নিত্তনৈমিত্তিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে গোপন আঁতাতের ধোঁয়াশা তুলে, প্রধান শিক্ষকদের না জানিয়েই পুরো সরকারি অর্থ গায়েব করে দেওয়ার সুগভীর চক্রান্তের অভিযোগও উঠে এসেছে।

 

বিশ্বস্ত সূত্রের ভিত্তিতে একাধিক প্রধান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাথে জানান, অফিসে টাকা কালেকশনের জন্য তার নিজস্ব কিছু অনুগত ‘দালাল চক্র’ ও নির্ধারিত শিক্ষক প্রতিনিধি রয়েছে, যাদের পকেটেও পৌঁছায় এই জুলুমের বকশিস। ২০২৬ সালে নির্বাচন ও ভোটকেন্দ্রের সংস্কার বরাদ্দের দেড় লাখ (১,৫০,০০০) টাকা থেকে বিদ্যালয় প্রতি ৫০ হাজার টাকা করে প্রকাশ্যে ঘুষ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। রুটিন মেইনটেন্যান্স ও মেরামতের বরাদ্দ থেকে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা কেটে নেওয়া তো নিত্যদিনের হিসাব। ভাবকী সন্ন্যাসীতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৭০ হাজার এবং জোয়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ৮০ হাজার টাকা নেওয়ার তথ্য আজ তার পকেটস্থ লাঘবের জ্বলন্ত দলিল। ফার্নিচার বেচে পাঁচশো কেজির ভুয়া হিসাব মিলিয়ে সহকর্মীদের খাসির মাংসে মুখ বন্ধ করার যে ‘শাহী দাওয়াত’ তিনি দিয়েছিলেন, তা শিক্ষা প্রশাসনের ইতিহাসে এক দুর্গন্ধময় অধ্যায়। তেরো লাখের পুরোনো মেরামতে আবার নতুন করে বিশ লাখের রূপকথা সাজিয়ে পুরো টাকা গিলে খেয়েছেন অনায়াসে।

 

একাধিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা হাহাকার করে বলেন, “আমাদের জীবনে এমন বেপরোয়া ও লোভাতুর শিক্ষা অফিসার দেখি নাই। টাকা ছাড়া তিনি একটি পাতাও উল্টান না, কোনো স্বাক্ষর করেন না।” বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে পান থেকে খসলেই কারণে-অকারণে শোকজ (Showcause) নোটিশের তোপ দাগানো এবং তা প্রত্যাহারের নামে মোটা অঙ্কের রফা করা ছিল তার দৈনিক আয়ের নিশ্চিত উৎস।

 

একইভাবে জিম্মি হয়ে পড়েছে এলাকার প্রাইভেট কিন্ডারগার্টেনগুলোও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিন্ডারগার্টেন প্রতিনিধিরা জানান, “অনলাইনে পাঠদানের অনুমোদন থেকে শুরু করে রেজিস্ট্রেশন বাতিল, প্রাথমিক সমাপনী বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাতিলের হুমকি দিয়ে তিনি আমাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। টাকা না দিলে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার আইনি জুজু দেখানো হয়।”

 

তবে টাকার লোভকে ছাপিয়ে গেছে তার মানসিক নিপীড়নের পৈশাচিক আনন্দ। ৩টা বাজলেই বাঘের মতো শিকার খোঁজা, টিফিন পিরিয়ডে বেঞ্চে একটু ক্লান্তি জিরোনো সচিববাড়ি স্কুলের চার শিক্ষকের ঘামঝরা বিশ হাজার টাকা পেনাল্টি আদায়, এ যেন এক নির্মম ক্রীড়া! সেই ক্রীড়ারই বলি ঝাপুপাড়া ইছামতি স্কুলের শিক্ষক আক্তার ফারুক। ঘুষের টাকা না দেওয়ায় আটকে থাকা বেতন, আর ব্যাংকের কিস্তির তাগাদার সাঁড়াশিতে পিষ্ট হয়ে তিনি ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। পশ্চিম গোবিন্দপুর থেকে সুবর্ণখুলী কোথাও শিক্ষকের বুকভাঙা আর্তনাদ, কোথাও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের হাসপাতালের আইসিইউ শয্যা; প্রতিটি কোণেই জমাট বেঁধে আছে এই টিইওর সীমাহীন নির্যাতনের চিহ্ন।

এই বিপুল রক্তচোষা টাকার শেষ গন্তব্য কোথায়? উত্তর মেলে দশমাইলের কোটি টাকার জমিতে, আর দিনাজপুর শহরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের গোপন বুকিংয়ে। অথচ এতদিন ইউএনওর রহস্যময় নীরবতা আর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের ‘তদন্ত সামলানো’র ঢাল টিইও হুমায়ুনকে বানিয়ে রেখেছিল ধরাছোঁয়ার বাইরের এক অধীশ্বর।

 

এই বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে সাবেক দিনাজপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এ এম শাহজাহান সিদ্দিক (বর্তমানে রংপুরে কর্মরত) স্বীকার করে বলেন, “আমি দিনাজপুরে থাকাকালীন মো: হুমায়ুন কবির তালুকদারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির পর্বতসম অভিযোগ পেয়েছিলাম।”অন্যদিকে, বর্তমানে দিনাজপুরের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো: সাইফুজ্জামান জানান, “আমি সদ্য চার্জে এসেছি, তাই বিস্তারিত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে হবে। তবে আমার পূর্বসূরি যদি অভিযোগ শুনে থাকেন এবং বিষয়টি সত্য হয়, তবে সরকারি চাকুরিতে এমন অনিয়ম-দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews