
নার্গিস রুবি: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জোনাল অফিস ৩/২ এর আওতাধীন এলাকায় ভবন মালিক হুমায়ুন মিয়া গং কর্তৃক অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে জি প্লাস নয় তলার স্থলে ১০ তলা ভবন নির্মাণ এবং ভবনের চতুর্দিকে অতিমাত্রায় নকশা বিচ্যুতি (ডেমিয়েশন) করার অভিযোগ উঠেছে। বসতি হাউসিং, বড়বাগ মিরপুর-২, ঢাকার ঠিকানায় উল্লেখিত জমির অবস্থান খতিয়ান নং ৬৫৪৪৯, সিএস দাগ নং ৪৭৭৩২, ৪৭৭৩১, ৪৭৭৭২৮, আরএস দাগ নং ১৩৪২২, ১৩২৪, ১৩২৬ এবং ঢাকা সিটি জরিপ নং ১৫১১৫ এ অবস্থিত এই ভবনটি নির্মাণে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা ২০০৮ এর একাধিক ধারা ও বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজউক জোনাল অফিস ৩/২ এর ইমারত পরিদর্শক আলিনুর এবং অথরাইজড অফিসার মাসুক আহমেদ বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত। তারা সরেজমিনে পরিদর্শন সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানিয়েছেন। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ভবন মালিক হুমায়ুন মিয়া গং এর সাক্ষাৎকার নেওয়া সম্ভব হয়নি।
আইনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ৩ (১) ধারা এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬ এর ৩ উপবিধি অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। একইভাবে ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা ২০০৮ অনুযায়ী ভবনের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদনপত্র এবং বসবাস বা ব্যবহার সনদপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক। বিধিমালা লঙ্ঘন করে কোনো ভবন নির্মাণ করা হলে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ১২ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। উক্ত আইনটি মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর তফসিলভুক্ত হওয়ায় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও এই অপরাধের বিচার করা যায়।
এ ছাড়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) অর্ডিন্যান্স ২০২৫ এর খসড়া অনুযায়ী মাস্টার প্ল্যান লঙ্ঘনের জন্য দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। নির্মাণাধীন অবস্থায় নকশা বিচ্যুতি বা অনুমোদনের বাইরে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়া অবৈধ ভবনের তালিকায় পড়ে। রাজউকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন প্রায় ৫ লাখ ১৭ হাজার ভবনের মধ্যে ৩ লাখ ১৭ হাজার ভবন অর্থাৎ ৬১ দশমিক ৩২ শতাংশ ভবনের কোনো অনুমোদন নেই। প্রতিবছর নির্মিত প্রায় ২০ হাজার নতুন ভবনের মধ্যে মাত্র ৯ হাজারের মতো ভবন অনুমোদিত হয়, বাকি ১১ হাজারের বেশি ভবন অনুমোদন ছাড়াই গড়ে ওঠে।
হুমায়ুন মিয়া গং এর ভবনটি নির্মাণে যে অনিয়ম ও বিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে:
অনুমোদিত নকশায় জি প্লাস নয় তলা নির্ধারিত থাকলেও ভবনটি ১০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে, যা ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ এর ভবন উচ্চতা সংক্রান্ত বিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। ভবনের চতুর্দিকে অতিমাত্রায় নকশা বিচ্যুতি (ডেমিয়েশন) করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) এবং রাজউকের বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর বিধান পরিপন্থী। ভবন মালিক আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করে নিজের খেয়ালখুশিমতো ভবনটি নির্মাণ করেছেন, যা ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ৩ (১) ধারার লঙ্ঘন। অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করায় ভবনটির বসবাস বা ব্যবহার সনদপত্র প্রাপ্তির যোগ্যতা হারিয়েছে, যা বিধিমালা ২০০৮ এর বসবাস সনদপত্র সংক্রান্ত বিধানের পরিপন্থী।
উল্লেখ্য, রাজউকের প্রতিটি জোনাল অফিসের অধীনে অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকদের দায়িত্ব হলো নির্মাণাধীন ভবনগুলোর ওপর নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব অবহেলা বা অবৈধ সুবিধা গ্রহণের কারণে অবৈধ ভবন নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজউকের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনুমোদনহীন বা নকশা লঙ্ঘনকারী ভবনের বিরুদ্ধে রাজউকের আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যাপক ত্রুটি ও অবহেলা পরিলক্ষিত হয়।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজউক যদি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করত এবং জোনাল অফিসগুলোর অধীনে নির্মাণাধীন ভবনগুলোর ওপর কঠোর তদারকি নিশ্চিত করত, তাহলে এ ধরনের নকশা লঙ্ঘন ও অনিয়মের ঘটনা কমে আসত। ভবন মালিকদের একার ওপর দোষ চাপিয়ে রাজউক নিজেদের দায় এড়াতে পারে না। কারণ কোনো ভবন নির্মাণের অনুমোদনপত্র, পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং বসবাস সনদপত্র ইস্যু করার সময় সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকদের স্বাক্ষর থাকে। তাদের স্বাক্ষরিত কাগজপত্রের ভিত্তিতেই ভবন নির্মাণ কাজ এগিয়ে যায়। সুতরাং নকশা লঙ্ঘন বা অনিয়মের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়ও অবশ্যই নির্ণয় করা উচিত।
বর্তমানে রাজউক জোনাল অফিস ৩/২ এর ইমারত পরিদর্শক আলিনুর এবং অথরাইজড অফিসার মাসুক আহমেদ সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত নোটিশ জারি বা ভবন নির্মাণ কাজ স্থগিত করার খবর পাওয়া যায়নি। অপরদিকে ভবন মালিক হুমায়ুন মিয়া গং এর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উক্ত ভবনের বিরুদ্ধে যদি রাজউক কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তাহলে এটি আরও একটি অনিয়মের নজির হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যতে অন্যান্য ভবন মালিকদের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। রাজউকের উচিত হবে অবিলম্বে উক্ত ভবনের নির্মাণ কাজ স্থগিত করা, অনুমোদিত নকশার সাথে বাস্তব নির্মাণের তুলনামূলক পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করা এবং আইন অনুযায়ী ভবন মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একই সাথে সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসার