বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
রূপসায় যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা।  দীর্ঘদিন সংস্কারহীন শিবগঞ্জের বলরামপুরের একমাত্র রাস্তা, ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ফসলী জমিতে অবৈধ ইটভাটা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ হুমকির মুখে।  জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি ফ্যাসিবাদের চরিত্র :: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের জন্য বিমান ভাড়ায় ৫০ শতাংশ ছাড় লোহাগড়ায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আলোচনা সভা ও গাছের চারা বিতরণ পটুয়াখালীতে চুরির ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত রাজধানীর দক্ষিণখানের কাওলায় ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণ রাজউক আইনের তোয়াক্কা না করে দুই দফা উচ্ছেদের পরও অবৈধ ১০ তলা ভবনে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই ভাড়াটিয়া প্রবেশ তানোরে ফ্যামিলি কার্ডের কর্মী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ বিক্ষোভ! লালমনিরহাটে ১১ শিক্ষক আর ২০০ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে এসএসসি পাসের হার ‘শূন্য’

রাজধানীর দক্ষিণখানের কাওলায় ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে বহুতল ভবন নির্মাণ রাজউক আইনের তোয়াক্কা না করে দুই দফা উচ্ছেদের পরও অবৈধ ১০ তলা ভবনে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই ভাড়াটিয়া প্রবেশ

  • প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

 

 

 

রাজউক আইনের তোয়াক্কা না করে দুই দফা উচ্ছেদের পরও অবৈধ ১০ তলা ভবনে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই ভাড়াটিয়া প্রবেশ

 

 

 

নার্গিস রুবি: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন দক্ষিণখানের শিয়ালডাঙ্গা এলাকায় নজরুল ইসলাম গং পরিচালিত একটি ১০ তলা ভবন নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। ভবনটি ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হলেও এবং রাজউক কর্তৃক দুই দফা উচ্ছেদ ও জরিমানা আরোপ সত্ত্বেও ভবন মালিক ও তার ভাড়াটিয়ারা অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই ওই ভবনে বসবাস করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

 

প্রথম উচ্ছেদ ও জরিমানা: জানা গেছে, ওই ভবনটি রাজউকের জোনাল অফিস ২/২ এর আওতাধীন এলাকায় অবস্থিত। অনিয়মের কারণে রাজউক প্রথমবার উচ্ছেদ অভিযান চালায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ তারিখে। ওই সময় ভবনের ব্যাত্যয়কৃত অংশ অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তিন লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়। এক মাসের মধ্যে ব্যাত্যয়কৃত অংশ অপসারণের নির্দেশনা থাকলেও ভবন মালিকরা তা উপেক্ষা করেন।

 

দ্বিতীয় উচ্ছেদ ও বর্ধিত জরিমানা: রাজউকের নির্দেশ অমান্য করে ভবন মালিকরা পুনরায় ইমারত নির্মাণ আইনের ব্যাত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ কাজ চালিয়ে যান। এ কারণে রাজউক দ্বিতীয়বার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে গত ২৯ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে। এবার জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি করে ১০ লক্ষ টাকা করা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় উচ্ছেদের পরও ভবন মালিকরা রাজউকের আইনের তোয়াক্কা না করে ভবনটি সম্পূর্ণ করে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে ভবনটি অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই ভবন মালিক ও তার ভাড়াটিয়ারা বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।

 

নকশা বিচ্যুতির অভিযোগ: এলাকাবাসী ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভবনটি শুরু থেকে ১০ তলা পর্যন্ত এবং পরে সম্পূর্ণ করার সময় চতুর্দিকে অতিমাত্রায় নকশা বিচ্যুতি বা ডেভিয়েশন করা হয়েছে। ভবনের নির্মাণ কাজ অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে সম্পাদন করা হয়েছে বলে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

 

রাজউক কর্মকর্তাদের বক্তব্য: রাজউক জোন ২/২ এর অথরাইজড অফিসার হাসানুজ্জামান এবং ইমারত পরিদর্শক অমল চন্দ্র মজুমদার জানান, ভবন মালিকরা রাজউকের আইন অমান্য করে ভবনে বসবাস করছেন। তারা আরও জানান, পুনরায় এই ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে ভবন মালিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, তারা রাজউকের সাথে যোগাযোগ করেই ভবন নির্মাণ করেছেন।

 

আইনী বিশ্লেষণ ও শাস্তির বিধান: বিষয়টি নিয়ে আইনগতভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে ভবন নির্মাণ নিয়ন্ত্রণের প্রধান আইন হলো দ্য বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২ (ইস্ট বেঙ্গল অ্যাক্ট নং ২ অফ ১৯৫৩)। এই আইনের ধারা ১২ অনুযায়ী, যে কেউ ধারা ৩ এর বিধান লঙ্ঘন করলে বা অথরাইজড অফিসার বা কমিটির ধারা ৩বি এর আদেশ পালনে ব্যর্থ হলে অথবা বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের বিধান লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ পরিকল্পনা প্রণয়ন, অনুমোদন বা বাস্তবায়ন করলে বা বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের বিধান লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ করলে, তাকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যেতে পারে। একই সঙ্গে আদালত ভবনটি ভেঙে ফেলার জন্য একটি তারিখ নির্ধারণ করতে পারেন এবং উক্ত তারিখের মধ্যে তা না করলে আদালত নিজে ভবন ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা করতে পারেন এবং খরচ দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছ থেকে আদায় করতে পারেন।

 

পাশাপাশি, সম্প্রতি জারি করা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬ অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণ করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। অধ্যাদেশের ৫৪ ধারায় এই শাস্তির বিধান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কৌশলগত পরিকল্পনা বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির পরিমাণ সর্বোচ্চ দশ কোটি টাকা অর্থদণ্ড ও দশ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

 

অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকের দায়িত্ব এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার শাস্তি:

 

বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২ এর ধারা ৩বি অনুযায়ী, অথরাইজড অফিসার বা কমিটি যখন কোনো ভবন অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদনের শর্ত লঙ্ঘন করে নির্মাণ হচ্ছে বলে অবহিত হন, তখন তিনি বা তারা ভবনের মালিক, দখলদার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে পারেন এবং ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার, খাল ভরাটের বা নির্মাণ কাজ বন্ধের নির্দেশ দিতে পারেন। ধারা ৩বি এর উপধারা ২ অনুযায়ী, নোটিশ প্রাপ্তির পর নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখতে হবে এবং উপধারা ৫ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে জরিমানা পরিশোধ ও সংশোধনী কাজ করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যদি কেউ তা না করে তবে উপধারা ৬ অনুযায়ী অথরাইজড অফিসার বা কমিটি ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিতে পারেন।

 

অধ্যাদেশ, ২০২৬ এ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো রাজউক কর্মকর্তা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নকশা বহির্ভূত নির্মাণ কাজে সহায়তা করেন বা জেনেও নিরব থাকেন, তবে তাকেও দুই বছরের কারাদণ্ড বা দশ লাখ টাকা জরিমানার আওতায় আনা যাবে। এই বিধানের ফলে এখন থেকে শুধু ভবন মালিক নয়, রাজউকের অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকদেরও দায়বদ্ধতা আইনতঃ নিশ্চিত করা হয়েছে। যদি কোনো অথরাইজড অফিসার বা ইমারত পরিদর্শক তার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন বা ঘুষ গ্রহণ করে অবৈধ নির্মাণ কাজকে প্রশ্রয় দেন, তবে তিনি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর আওতায় অসদাচরণের দায়ে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি দণ্ডবিধি ও দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের আওতায় শাস্তিও ভোগ করতে পারেন।

 

অভিযোগ ও প্রতিকার: একজন সংশ্লিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, রাজউকের অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকদের দায়িত্ব হলো নিয়মিত তদারকি করে নির্মাণ কাজ আইন অনুযায়ী হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন কোনো ভবন দুই দফা উচ্ছেদের পরও পুনরায় নির্মাণ করা হয় এবং তাতে অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই বসবাস করা হয়, তখন স্পষ্ট যে সংশ্লিষ্ট অফিসার ও পরিদর্শকদের তদারকিতে ঘাটতি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, যদি রাজউকের কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতেন তবে এই ভবনটি দ্বিতীয়বার নির্মাণ করা সম্ভব হতো না।

 

আরেকজন আইন বিশেষজ্ঞ বলেন, ভবন মালিকের বিরুদ্ধে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট, ১৯৫২ এর ধারা ১২ এবং রাজউক অধ্যাদেশ, ২০২৬ এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা রুজু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে, যদি অথরাইজড অফিসার বা ইমারত পরিদর্শক ঘুষ গ্রহণ করে বা দায়িত্বে অবহেলা করে এই অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, তবে তাদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ও সরকারি কর্মচারী শৃঙ্খলা বিধিমালার আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি মনে করেন, শুধু ভবন মালিককে জরিমানা ও উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না, রাজউকের অভ্যন্তরে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।

 

অকুপেন্সি সার্টিফিকেটের গুরুত্ব: জানা গেছে, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ভবন নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার পর অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়া ওই ভবনে বসবাস বা ব্যবসা পরিচালনা করা আইনতঃ নিষিদ্ধ। এই সার্টিফিকেট নিশ্চিত করে যে ভবনটি নির্মাণ নিয়ম অনুযায়ী নির্মিত হয়েছে এবং বসবাসের জন্য নিরাপদ। অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই বসবাস করা হলে তা ভবনের বাসিন্দা ও পার্শ্ববর্তী ভবনের বাসিন্দাদের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

 

পরবর্তী আইনী পদক্ষেপ: রাজউক জোন ২/২ এর অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শক জানিয়েছেন, তারা পুনরায় এই ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন, দুই দফা উচ্ছেদ ও জরিমানা সত্ত্বেও কীভাবে এই ভবনটি সম্পূর্ণ হয়ে বসবাসযোগ্য হলো এবং কেন অকুপেন্সি সার্টিফিকেট ছাড়াই ভাড়াটিয়ারা সেখানে প্রবেশ করতে পারলেন। তারা মনে করেন, রাজউকের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না এবং সংশ্লিষ্ট অফিসার ও পরিদর্শকদের তদারকি ও দায়বদ্ধতাও যাচাই করা দরকার।

 

বর্তমানে রাজধানীতে অবৈধ ও নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণ একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। রাজউকের নতুন অধ্যাদেশে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে রাজউকের অভ্যন্তরীণ তদারকি ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে হবে বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও আইন বিশেষজ্ঞরা। শুধু ভবন মালিককে দায়ী করে নয়, যেসব কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন বা অনিয়মকে প্রশ্রয় দেন তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া গেলেই নগরায়ণের এই অনিয়ম কমে আসবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
Theme Customized By BreakingNews