
নার্গিস রুবি: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মোবাইল কোর্টের নির্দেশনা অমান্য করে নকশা বহির্ভূত অংশ পুনরায় নির্মাণ করার অভিযোগে মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিংয়ে দুটি আবাসিক প্লটের মালিককে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছে রাজউক। সংস্থাটি ওই প্লটগুলোর সকল ধরনের নির্মাণ ও ব্যবহার কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে এবং ব্যর্থতায় আইনানুগ ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ঘটনাটি রাজধানীতে নকশা বহির্ভূত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণে রাজউকের তদারকি ও আইনি প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জকে নতুন করে সামনে এনেছে।
জানা গেছে, বাড়ি নং ৩৫, রোড নং এন-৫, ব্লক- এইচ, ইস্টার্ন হাউজিং (দ্বিতীয় পর্ব), মিরপুর, ঢাকায় অবস্থিত ভবনটির চার তলা পর্যন্ত নির্মাণের জন্য রাজউক হতে নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়। কিন্তু ভবন মালিক ডলি খানের নির্দেশনায় ডেভেলপার কোম্পানি অবৈধভাবে পাঁচ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করে। পরে রাজউক পাঁচ তলা অবৈধ বলে ঘোষণা করে উহা অপসারণের নির্দেশ দিলেও তা না মেনে অবৈধভাবে ছয় তলা নির্মাণ করা হয়। এতে উচ্ছেদ অভিযানে পাঁচ তলার ছাদ কেটে দেওয়া হয়েছিল। অপরদিকে প্লট নং ৩৪, রোড নং এন-৫, ব্লক- এইচ, ইস্টার্ন হাউজিং (দ্বিতীয় পর্ব), মিরপুর, ঢাকায় অবস্থিত আরেকটি ইমারতের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। রাজউক অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ কাজ করায় গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সংস্থাটি ওই প্লটে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ইমারতের নকশা বহির্ভূত আংশিক অংশ ভেঙ্গে অপসারণ করে। একই সাথে অবশিষ্ট ব্যত্যয়কৃত অংশ নিজ দায়িত্বে অপসারণ করবেন মর্মে প্লট মালিককে অঙ্গীকারনামা প্রদান করতে বলা হয়। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, প্লট মালিক নকশা বহির্ভূত অংশ অপসারণ না করে উল্টো পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু করেছেন। এ অপরাধে দুই ভবন মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে ফৌজদারী অপরাধের জন্য মামলা দায়ের করেনি রাজউক।
রাজউকের ১০ জুন ২০২৬ তারিখের নোটিশে এ ধরনের কার্যক্রমকে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাজউক প্লট মালিকদের প্রশ্ন করেছে যে, নির্মিত ও নির্মাণাধীন ইমারতের ব্যত্যয়কৃত অংশ সম্পূর্ণরূপে ভেঙ্গে অপসারণ না করে কেন পুনরায় নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে লিখিতভাবে কারণ দর্শাতে নোটিশে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই ইমারতগুলোর সকল ধরনের নির্মাণ, পুনঃনির্মাণ ও ব্যবহার কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্যও বলা হয়েছে। রাজউক সতর্ক করে দিয়েছে, নির্দেশনা অনুসরণে ব্যর্থ হলে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিষয়টি আইনি দিক থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ৩ ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো ইমারত নির্মাণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। একই আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অন্যূন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এছাড়া মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর তফসিলভুক্ত হওয়ায় এই আইনের অধীনে অপরাধগুলো মোবাইল কোর্টের মাধ্যমেও বিচার্য। অর্থাৎ রাজউক মাঠ পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে এ আইনের ভিত্তিতে।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্প্রতি সরকার দীর্ঘ সাত দশকের পুরনো টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩ রহিত করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি করেছে। নতুন এই অধ্যাদেশে নকশা বহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। একই সাথে কৌশলগত পরিকল্পনা বা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা জরিমানা এবং ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। অধ্যাদেশের ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি অনুমোদিত নকশা বহির্ভূত স্থাপনা নির্মাণ করলে তিনি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া অধ্যাদেশে রাজউকের কোনো কর্মকর্তা যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নকশা বহির্ভূত নির্মাণ কাজে সহায়তা করেন বা জেনেও নিরব থাকেন, তবে তাকেও দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা ১০ লাখ টাকা জরিমানা ভোগ করতে হবে বলে বিধান করা হয়েছে।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলাম বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মেনে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংস্থাটি ইতোমধ্যে রাজউক এলাকায় নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মিত ৩ হাজার ৩৮২টি নির্মাণাধীন ভবন চিহ্নিত করেছে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রথম ধাপে অবৈধ ভবনগুলোর ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, ফৌজদারি মামলা দায়ের করা, নকশা বাতিল করা এবং প্রয়োজনে ভবন সিলগালা করার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রাজউক চেয়ারম্যান আরও জানিয়েছেন, তিনি দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন এবং নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।
রাজধানীতে নকশা বহির্ভূত ও অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ইমারত নির্মাণের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবনের একটি বড় অংশ নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও পল্লবী এলাকায় প্রায় ৯৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভবন, রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁও এলাকায় প্রায় ৯৭ শতাংশ ভবন এবং ধানমন্ডি এলাকায় প্রায় ৮৯ শতাংশ ভবন নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে। এমনকি ১০ তলার ওপর ১ হাজার ৮১৮টি বহুতল ভবনের মধ্যে ৮৪ শতাংশই নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে বলে রাজউকের জরিপে প্রমাণিত হয়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া এবং পরবর্তীকালে এর ওপর নজর রাখার