
বিশেষ প্রতিবেদন
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিতর্কিত এনবিআর চেয়ারম্যান জনাব আব্দুর রহমান খানের চাকরির বয়সজনিত মেয়াদ আজ, ২৯ জুন ২০২৬, আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলো।
একটি দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তাঁর কর্মদক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনস্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।
দেশের রাজস্ব ব্যবস্থায় এখনও বিতর্কিত কারণে বৃহত্তর একটি খাত রাজস্ব ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ দুর্নীতির পরিচালনার মাধ্যমে দেশের সর্বোচ্চ রাজস্ব খাতে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে এর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিটি বিভাগে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে নিজস্ব একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট গড়ে তুলে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান তিনটি সরকারের মেয়াদকাল অতিক্রম করে আজ ২৯ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বহাল রয়েছেন জনাব আব্দুর রহমান খান। এ যেন এক আলাদিনের চেরাগের ইতিহাস।
বিশেষ গভীর অনুসন্ধানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে এনবিআরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, আজ পর্যন্ত এনবিআর চেয়ারম্যান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণ করেছেন। নির্দোষ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এমন পর্যায়ে হয়রানি করা হয়েছে যে তাঁদের পরিবারের স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের ব্যাংক হিসাব পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবসায়ী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মহল মনে করেন, এই বিতর্কিত চেয়ারম্যান যদি পরবর্তীতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে বহাল থাকেন, তাহলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব খাত আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় দক্ষ, স্বচ্ছ কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন। তাঁদের মতে, একজন চেয়ারম্যান যদি দুর্নীতি, অর্থপাচার ও প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে থাকে বলে জানা যায়-বারবার বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আলোচিত হন, তাহলে তাঁকে নিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ব্যবসায়ীরা কতটুকু আশা করতে পারেন-এ প্রশ্ন থেকেই যায়।
বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, অসন্তোষ ও সংকটের মুখে রয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষ নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছে।
সকল মহলের প্রত্যাশা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এমন একজন চেয়ারম্যান পাক, যিনি হবেন সৎ, দক্ষ, নিরপেক্ষ, সাহসী এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন। যিনি করদাতাবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলবেন, হয়রানি কমাবেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন এবং পূর্বে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, সেসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করবেন।
অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা, দুদকে অভিযোগ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এমনকি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খান নিজে যে নিজ দপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীর নামে দুদকে নিজে যেয়ে তদবির করেছেন ফলে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবার মানসিক, সামাজিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, অর্থের বিনিময়ে অনেক বিষয় আব্দুর রহমান খান চেয়ারম্যান কিছু আংশিক কর্মকর্তা কর্মচারীর শাস্তি কালো আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সেটিও একটি শাস্তির মতো অপরাধ যোগ্য।
ভুক্তভোগীদের তাঁদের আরও দাবি, জনাব আব্দুর রহমান খানের আয়-ব্যয় ও সম্পদের বিষয়ে একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি জাতির সামনে উপস্থাপন করা জরুরি। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, মত দিয়েছেন যে তিনি যেন দেশ ত্যাগ করতে না পারেন এবং রাষ্ট্রের কাছে তাঁর কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়।
রাষ্ট্র টিকে থাকে আইনের শাসনে, ক্ষমতার অপব্যবহারে নয়। অভিযোগ রয়েছে, জনাব আব্দুর রহমান খান ক্ষমতার অপব্যবহার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্ত করেছেন, বেতন গ্রেড কর্তন করেছেন এবং রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে অবসরেও পাঠিয়েছেন। এমনকি একজন পিয়ন পর্যন্ত জনাব আব্দুর রহমান স্যার দেয়নি ক্ষমতার অপব্যবহার এর মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে বিচার হওয়া উচিত বলে বিশেষ মহল মনে করেন।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি ক্ষমতার প্রদর্শনে নয়; বরং আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় নিহিত। সরকারি দায়িত্ব একটি সম্মানজনক আমানত। অভিযোগ রয়েছে, এনবিআরের আন্দোলনের ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের পরিবর্তে নির্দোষ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, আর যাঁরা অর্থ দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা শাস্তির পরিবর্তে পদোন্নতি পেয়েছেন।
সরকারপ্রধানের কাছে একাধিক মহলের দাবি, জনাব আব্দুর রহমান খানের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একটি সরকারি দপ্তর ব্যক্তিগত ইচ্ছা, প্রভাব কিংবা প্রতিহিংসার ভিত্তিতে নয়; আইন, ন্যায়নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিধিবিধানের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত।
যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার অপব্যবহার, অন্যায় বদলি, পক্ষপাতিত্ব, প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ কিংবা যথাযথ তদন্ত ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছাড়াই কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু কয়েকজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা, প্রশাসনের মর্যাদা এবং ন্যায়বিচারের ভিত্তি।
একজন সৎ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা বা কর্মচারী রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ। তাঁদের সম্মান, ন্যায্য অধিকার ও পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করা যেমন রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তেমনি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আইনসম্মতভাবে তদন্ত করা রাষ্ট্রের সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত আইনের আলোকে—ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার বলে নয়। কারণ পদমর্যাদা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ন্যায়বিচার, সততা এবং আইনের মর্যাদা চিরস্থায়ী।
আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে ক্ষমতা হবে সেবার প্রতীক, আইন হবে সবার জন্য সমান, সততা হবে সর্বোচ্চ মূল্যবোধ এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন অন্যায়ের শিকার না হন।
ন্যায়বিচারই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি। স্বচ্ছতা এবং ছোট-বড় সকল কর্মকর্তার জন্য সমান আইন নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মরণের কাফনের কাপড়ে কোনো পকেট থাকে না। কী নিয়ে ওই কবরে যাবেন, জনাব আব্দুর রহমান খান? কেন এত অর্থের লোভ, প্রতিহিংসার লোভ এবং অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রবণতা? ভেবে দেখুন—সত্য, ন্যায় এবং আইনের শাসনই হবে উন্নত বাংলাদেশের সবচেয়ে দৃঢ় ভিত্তি।