
এম এইচ মুন্না: একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন দীর্ঘ দেড় দশক ধরে পেশাদারিত্ব বিসর্জন দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের আজ্ঞাবহ লাঠিয়াল বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়, তখন তার প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অব কমান্ড কতটা পচনশীল ও ভঙ্গুর রূপ নিতে পারে, তার নিকৃষ্টতম জীবন্ত দলিল এখন ময়মনসিংহ বিভাগ। বিগত ফ্যাসিবাদের জঘন্যতম অনুষঙ্গ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তথাকথিত ‘মাস্টারমাইন্ড’ এবং লুণ্ঠনমূলক দুর্নীতির খলনায়কেরা পটপরিবর্তনের পরও অদৃশ্য জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় অক্ষত রয়ে গেছে। স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, ময়মনসিংহের কুখ্যাত ‘গাঙ্গিনারপাড় নিষিদ্ধ পল্লী’ কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক নারী পাচার, জোরপূর্বক দেহব্যবসায় বাধ্যকরণ এবং ইয়াবা-ফেনসিডিলসহ মারাত্মক মাদকের চোরাচালানের মূল নিয়ন্ত্রকরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এছাড়া শহরের কাচারি রোড, সেহড়া এবং ধোপাখলা এলাকায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির কারিগরেরা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে আক্ষরিক অর্থেই নিজেদের পকেটস্থ করে ফেলেছে। এই তদন্তের সবচেয়ে কদর্য দিকটি উন্মোচিত হয় যখন বর্তমান কোতোয়ালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শিবিরুল ইসলামের অতীত ও বর্তমান কার্যক্রম ব্যবচ্ছেদ করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই যুবলীগ ক্যাডার ও মাদক সম্রাটদের সাথে ওসি শিবিরুল ইসলামের পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্ক দীর্ঘ ১৫ বছরের পুরনো।
২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচন কমিশনের কঠোর নির্দেশনায় বিতর্কিত ও দীর্ঘদিন একই স্টেশনে জেঁকে বসা পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এই সিন্ডিকেটের কর্মকর্তারাও নির্বাচনের ঠিক ২৮ দিন আগে তড়িঘড়ি করে ময়মনসিংহের আশেপাশের জেলায় বদলি হয়ে যান। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক ২৭ দিনের মাথায়, অর্থাৎ সরকার গঠনের পরপরই, এক অদৃশ্য জাদুর কাঠির সুবাদে ফেঁপে উঠেন কিছু সুবিধাভেগী পুলিশ অফিসার। অনুসন্ধান বেরিয়ে এসেছে ময়মনসিংহ রেঞ্জের পুলিশ কর্মকর্তাদের পোস্টিং ও বদলির গোপন নথিপত্র খতিয়ান থেকে। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পর পর বদলি করার বিধান থাকলেও, এই অঞ্চলের একদল বিতর্কিত কর্মকর্তা বদলি নাটকের আড়ালে বছরের পর বছর ধরে একই রেঞ্জে কামড় দিয়ে পড়ে আছেন এবং তৈরি করেছেন এক অভেদ্য মাফিয়া চক্র।
জানা যায়, ওসি শিবিরুল ইসলাম দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে অলৌকিক ক্ষমতাবলে এই ময়মনসিংহ রেঞ্জেই ঘুরেফিরে বহাল আছেন; কখনো সেকেন্ড অফিসার, কখনো অন্য ফাঁড়ি বা থানা, আর এখন প্রধান কোতোয়ালী থানার মসনদে। ত্রিশাল থানার ওসি মনসুর আহমেদ বিগত ১২ বছর ধরে কোনো এক অজ্ঞাত জাদুবলে ময়মনসিংহ জেলা ছাড়েননি। গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল পদে বছরের পর বছর ধরে ময়মনসিংহ দক্ষিণে নিজের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রেখেছেন ওসি ডিবি মাহবুব, যা অপরাধ দমনের চেয়ে অপরাধীদের সাথে পার্টনারশিপ গড়ার কাজে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ। নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা খন্দকার মামুন দীর্ঘ ৯ বছর ধরে একই সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও বালু মহালের শত কোটি টাকার সিন্ডিকেট টিকিয়ে রাখতেই রাজত্ব করছেন। নেত্রকোনা সদর থানার ওসি সাকের মাহমুদও সেখানে কামড় দিয়ে বসে থাকার পাশাপাশি দীর্ঘ ৯ বছর ধরে এই ময়মনসিংহ রেঞ্জের বাইরে যাননি। এমনকি মুক্তাগাছা থানার ওসিও ক্ষমতার অমোঘ দাপটে দীর্ঘ ৭ বছর ধরে নিজের চেয়ারটিকে পৈতৃক সম্পত্তির মতো আগলে রেখেছেন।
দৈনিক গণতদন্ত ময়মনসিংহের রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের বিগত ১৫ বছরের পদায়নের নথিপত্র পর্যালোচনা করে এক লোমহর্ষক ইতিহাস খুঁজে পেয়েছে। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে ময়মনসিংহ রেঞ্জে একে একে দায়িত্ব পালন করেছেন ডিআইজি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন (যিনি পরবর্তীতে বিতর্কিত আইজিপি হয়েছিলেন), ডিআইজি বাবু নিবাস চন্দ্র মাঝি, ডিআইজি ব্যারিস্টার হারুন এবং ডিআইজি দেবদাস। তাদের পর স্থলাভিষিক্ত হন অতিরিক্ত রেঞ্জ ডিআইজি শাহ আবেদ। একইভাবে ২০১৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত এসপি ছিলেন মোঃ মঈনুল হোসেন এবং ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত এসপি ছিলেন সৈয়দ নূরুল ইসলাম। পরবর্তীতে ২০১৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত এসপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শাহ আবেদ, যাকে পদোন্নতি দিয়ে ময়মনসিংহের রেঞ্জ ডিআইজি করা হয়। ২০১৭-১৮ সালের দিকে যখন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন রেঞ্জ ডিআইজি এবং সৈয়দ নূরুল ইসলাম ময়মনসিংহের এসপি ছিলেন, তখন বর্তমান কোতোয়ালী ওসির দায়িত্বে থাকা শিবিরুল ইসলাম ছিলেন ওই থানার সেকেন্ড অফিসার। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ডিবির ওসি আশিক, কোতোয়ালী থানার তৎকালীন ওসি, ওসি (তদন্ত) এবং এই সেকেন্ড অফিসার শিবিরুল ইসলামের সমন্বয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কিলিং স্কোয়াড গড়ে ওঠে। এই সিন্ডিকেট মাত্র ৩ মাসে ময়মনসিংহে ২৯ জনকে ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করে। এই ২৯ জনের তালিকার সর্বশেষ ব্যক্তিটি ছিলেন একজন নারী যার নাম রেহেনা বেগম, সাং-সানকিপাড়া, ক্যান্টনমেন্ট সিনেমা হলের পেছনে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ইয়াবা ও ফেনসিডিল ব্যবসায়ীদের সাথে এই পুলিশ কর্মকর্তাদের রয়েছে গভীর সখ্যতা। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে, তারা কক্সবাজারের কুখ্যাত সাবেক ওসি প্রদীপের মতো ব্ল্যাকমেইল ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে পুরো জেলা নিয়ন্ত্রণ করতেন। মাদক সিন্ডিকেটের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই পুলিশ কর্মকর্তারা বিগত বছরগুলোতে শত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছেন এবং তা বিদেশে পাচার করেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের কল করা হলেও ফোন রিসিভ না করায় তাদের মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।